
অনলাইন ডেস্ক : জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, প্রতিযোগিতামূলক এবং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত বলে অভিহিত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন । শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজাবস।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশে একটি সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান জানায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ছিল সুশৃঙ্খল, পেশাদার এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত।
ইভার্স ইজাবস উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করেছে এবং স্টেকহোল্ডারদের আস্থা অর্জনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের সংশোধনীগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হয়েছে। তিনি বলেন, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে—সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের দ্রুত জবাব দেওয়া, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়া তার প্রমাণ।
তবে প্রতিবেদনে কিছু উদ্বেগের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পায়। ইইউ মিশন শারীরিক সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৬টি ঘটনার তথ্য পেয়েছে, যার ফলে ২৭টি জেলায় অন্তত ২০০ জন হতাহত হয়েছেন। যদিও এসব ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল এবং কোনো সুসংগঠিত বা নিয়মতান্ত্রিক ধারা পরিলক্ষিত হয়নি, তবুও অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে ভূমিকা রেখেছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত পাঁচ জনের মৃত্যুর তথ্যও তুলে ধরা হয়।
নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে হতাশাজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশ ছিলেন নারী। বিএনপি ১০ জন এবং এনসিপি ২ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও জামায়াতে ইসলামীসহ আরও প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই সনদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, বৈষম্য, ডিজিটাল ও শারীরিক হয়রানি নারীদের নির্বাচনী অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তাদের জন্য আলাদা বা বিশেষ কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জনপরিসরে, বিশেষত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, ধর্মীয় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যের বৃদ্ধি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন জানায়, নির্বাচনী আইনি কাঠামো সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড পূরণ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা জোরদার করতে আরও সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে আইনি ফাঁকফোকর দূর করা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সব মিলিয়ে, মিশনের প্রাথমিক মূল্যায়নে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহিংসতামুক্ত ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।তথ্যসূত্র : রূপালী বাংলাদেশ
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST