
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী অঞ্চলের সারি সারি আমবাগানে এখন কেবল মুকুলের সমারোহ। ফাগুনের এই সময়ে গাছে গাছে মুকুলের রং মিশে হলুদ আর সবুজের মহামিলন। মুকুলে ভরে গেছে প্রতিটি গাছ। সুবাসিত গন্ধে মাতোয়ারা চারিদিক। গাছে গাছে দৃশ্যমান সোনালি মুকুলের আভা। মুকুলের ভারে নুয়ে পড়ার উপক্রম প্রতিটি গাছ। মৌসুমের শুরুতেই পর্যাপ্ত মুকুলের সমারোহে আনন্দে নাচতে শুরু করেছে কৃষকের প্রাণ। তবে এবার রাজশাহী জেলাতে কমেছে আমের বাগান। নওগাঁ জেলায় বেড়েছে আমের বাগান।
রাজশাহী অঞ্চলের শতভাগ গাছেই কম-বেশি মুকুল এসেছে এবার। ইতোমধ্যে আগাম জাতের কিছু গাছে আমের সবুজ গুটিও দেখা যাচ্ছে। এ বছর আবহাওয়াও অনুকূলে। তাই বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছে রাজশাহী কৃষি বিভাগ। আর কৃষকরা বলছে, গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ দেখে মনে হচ্ছেÑ এবারও আমের বাম্পার ফলন হবে এ অঞ্চলে।
এবারও সোনালি স্বপ্নে বিভোর রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষি আর বাগান মালিকরা। গতবারের লোকসান কাটিয়ে এবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছে চাষি ও ব্যবসায়ীরা। গেলবারের চেয়ে এবারে রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় সব গাছেই এসেছে মুকুল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবারও আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
গেল বছর ফলন ভালো হলেও অতিবৃষ্টির কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন চাষিরা।
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠন করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল। এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। এতে গাছ আছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। এসব গাছে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত মুকুল এসেছে। পর্যায়ক্রমে সব গাছে শতভাগ মুকুল চলে আসবে আশা করছে কৃষি অফিস ও চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য বলছে, গেল মৌসুমে রাজশাহীতে ২ লাখ ৬০ হাজার টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন, নওগাঁয় ৪ লাখ ৩২ হাজার টন এবং নাটোরে ১ লাখ ৩৪ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছে। এবার উৎপাদন আরও বেশি হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
রাজশাহী জেলাতে আমবাগান আছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে। গেল বছর ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর। এক বছরে কমেছে ৫৪১ হেক্টর আম বাগান। আমের গাছ আছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৭টি। মুকুল এসেছে ৬০ শতাংশ। নওগাঁ জেলাতে ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আছে আমের বাগান। গেল বছর পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। জেলায় ২ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৫টি আমগাছ আছে। মুকুল এসেছে ৭১ শতাংশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগান আছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে। গেল বছর ছিল ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমিতে আম বাগান। জেলায় জমি কমেছে ১৭ হেক্টর। আমগাছ আছে ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি। আমের মুকুল এসেছে ৭০ শতাংশ। নাটোরে আমবাগান আছে ৫ হাজার ৬৯ হেক্টর জমিতে গাছ আছে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭টি গাছ। মুকুল এসেছে ৫৩ শতাংশ। কৃষিবিভাগ বলছে, এখনও অনেক গাছে মুকুল আসেনি। যেগুলোতে মুকুল এসেছে মৌসুমের শুরুতে সে আমগুলো পাওয়া যায়।
রাজশাহী বাঘা উপজেরার আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, গেলবারের চেয়ে এবার গাছে বেশি মুকুল এসেছে। বড় ঝড় না হলে প্রচুর আম পাওয়া যাবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলনও খুব ভালো হবে। তবে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে। পরিচর্যাও করা হচ্ছে।
পুঠিয়ার আমচাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো আছে। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার তা রোদের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গাছে গাছে অনেক মুকুল এসেছে। এই রকম আবহাওয়া আর ১০ দিন থাকলে আরও ভালো পরিমাণে মুকুল আসবে।
তিনি বলেন, গত বছর মুকুল ভালো হলেও বাজারজাতের সময় টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। এ বছর ভালো মুকুল আর ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, আমের ফলন এবার খুবই ভালো হবে বলে আশা করছি। পাশাপাশি এবার যাতে চাষিরা আম রফতানি করতে পারেন, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে। প্রতিটা উপজেলায় এ ব্যাপারে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। আশা করছি এবার ভালো আম রফতানি হবে।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার শীত খুব সুন্দরভাবেই শেষ হয়েছে। শেষের দিকে কোনো কুয়াশা ছিল না, বৃষ্টিও হয়নি। তাপমাত্রাটা বেড়েছে ধীরে ধীরে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ফলে গাছ মুকুল দেওয়ার সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পেরেছে।
তিনি বলেন, এবার আবহাওয়া মুকুলের জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল। তা ছাড়া গতবার মুকুল একটু কম এসেছিল। যেসব গাছে মুকুল কম ছিল, সেগুলোতেও এবার মুকুল এসেছে। এ কারণে প্রচুর মুকুল দেখা যাচ্ছে। এখন চাষিদের গাছে সেচ দিতে হবে। আর মুকুল আসার পর একবার ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। তাহলে মুকুল টিকে যাবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী জুলফিকার আলী বলেন, চাষিরা আম গাছ কাটছেন, এর মূল কারণ লাভ কমে গেছে। আমের উৎপাদন কমে গেছে। মার্কেটে দাম তেমন পাচ্ছে না। আগে রাজশাহী অঞ্চলে প্রচুর আম হতো। এখন নওগাঁ সেই জায়গাটা দখল করেছে। সাতক্ষীরা এখন বান্দরবানের কিছু এলাকায় আমের চাষ হচ্ছে। রাজশাহীতে এক সময় ধানের চাষ বেশি হতো। চাষিরা মনে করেছিলেন ধানের থেকে আম চাষ লাভজনক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে চালের দাম বেশি ও ডিমান্ডও বেশি। তার কারণে এখন দেখা যাচ্ছে, চাষিরা মনে করছেন আম বাদ দিয়ে আমাদের ধানচাষে চলে যাওয়া ভালো। এটা একটা বড় কারণ।
তিনি বলেন, আমাদের রাজশাহীর আমগুলো লেট ভ্যারাইটির। সাতক্ষীরার আমগুলো বাজারে আগে আসে। তারা কিছু ভালো দাম পায়। রাজশাহী, নওগাঁ ও রংপুর অঞ্চলের আমগুলো বেশিরভাগই লেট ভ্যারাইটিস। এসব আমগুলো একই সময়ে বাজারজাতকরণ হয়। এই কারণে প্রচুর আম বাজারে সরবরাহ চলে আসে। সঙ্গত কারণে দাম কমে যায়। আম যেহেতু একটি প্রচনশীল দ্রব্য, ইচ্ছা করলেই চাষিরা আলু বা অন্য ফসলের মতো রেখে দিতে পারেন না। সংরক্ষণের উপায় নেই। যার কারণে দাম না পেয়ে তার পরের বছর আর চাষিরা এটা চাষ করতে চান না।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST