
মোঃ আবুবকর সিদ্দীক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত হলো প্রথম হজ। দায়িত্ব গ্রহণের পর হজ ব্যবস্থাপনা যে পর্যায়ে ছিলো সেখান থেকেই এটিকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে সরকার। মাত্র দুইমাসের মাথায় শুরু হবে হজ ফ্লাইট-এরূপ বাস্তবতায় হজযাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করাকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে সরকার। হজযাত্রীদের সেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ‘হজযাত্রীদের এমনভাবে সেবা করতে হবে যেন তাদের কাছে দোয়া চাইতে না হয়, বরং তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে দোয়া করেন’- প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাই ছিলো এবছর হজযাত্রী সেবার মূলমন্ত্র। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার আলোকে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের নেতৃত্বে আল্লাহর মেহমানদের সর্বোত্তম সেবার ব্রত নিয়ে কাজ করেছে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ হজ অফিস, জেদ্দা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকারকে হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে হজযাত্রীদের জন্য অভিনব কিছু সেবাও চালু করেছে সরকার। সৌদি সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হজযাত্রীদের জন্য অনলাইনে বাড়িভাড়া চুক্তি সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও কয়েকটি হজ এজেন্সি বাড়িভাড়া নিয়ে কালক্ষেপণ করছিলেন। এরূপ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাড়িভাড়া চুক্তি স্বাক্ষর করা না হলে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীদের হজ পালন আশঙ্কা মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এ অবস্থায়, হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) ও আরো কয়েকটি সরকারি সংস্থাকে নিয়ে একটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে হজ এজেন্সিগুলো যথাসময়ে বাড়িভাড়া সম্পন্ন করানো হয়।
এবছর হজে মেডিকেল ফিটনেসের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে ছিলো সৌদি সরকার। বিমানবন্দরে অবতরণের পরও যদি কেউ মেডিকেল ইস্যুতে অনুপযুক্ত হয় সেক্ষেত্রে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছিল সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়। তাছাড়া, হজ ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সৌদি সরকারের হজ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ‘নুসুক মাসার’ নামক অনলাইন প্লাটফর্মে এই সার্টিফিকেট আপলোড ব্যতীত হজযাত্রীদের ভিসা ইস্যু করা হয় না। একারণে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণের বিষয়টির ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে।
বিগত বছরগুলোতে এই মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশি হজযাত্রীদেরকে দেশে আসতে হতো এবং এখানে নির্ধারিত হাসপাতালসমূহে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণ করতে হতো। এ প্রক্রিয়াটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অধিকন্তু, ছুটি প্রাপ্তির বিড়ম্বনাও আছে। একারণে বিগত কয়েক বছর যাবৎ প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনুরোধ করে আসছিলেন তাদেরকে যেন অবস্থানরত দেশেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। এবছর ধর্মমন্ত্রীর পরামর্শে এ বিষয়টির সুরাহা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হাবের সাথে আলোচনাক্রমে প্রবাসী বাংলাদেশী হজযাত্রীদেরকে অবস্থানরত দেশেই সেদেশের সরকার অনুমোদিত যেকোনো হাসপাতাল হতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং ফিটনেস সনদ সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাস/হাইকমিশনের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সরকারের এ উদ্যোগ প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিকট প্রশংসিত হয়েছে। এ উদ্যোগ গ্রহণের ফলে যাতায়াত খরচ ও ছুটি প্রাপ্তির বিড়ম্বনা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রক্ষা পেয়েছে। অধিকন্তু, এ সিদ্ধান্তের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই হজযাত্রীদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়।
হজ চুক্তি অনুসারে মোট হজযাত্রীর ৫০ শতাংশ পরিবহন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং বাকি ৫০ শতাংশ সাউদিয়া ও ফ্লাইনাস এয়ারলাইন্স। হজ ফ্লাইটের প্রথম ফেজে বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট সংখ্যা কম থাকায় যাত্রী পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রথম ফেজে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে হজযাত্রীদের টিকিটের যে চাহিদা ছিলো সেটা মেটানোর জন্য চারটি অতিরিক্ত ফ্লাইটের প্রয়োজন দেখা দেয়। এই চারটি ফ্লাইট ছাড়া হজ এজেন্সি থেকে শতভাগ টিকিটের পে-অর্ডার পাওয়া সম্ভব নয়। এহেন পরিস্থিতিতে ধর্মমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও হাবের সাথে একাধিকবার বৈঠকে বসে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে সৌদি বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা জেনারেল অথোরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (গাকা) এর সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয়সংখ্যক নতুন ফ্লাইট অনুমোদন নেয়ার বিষয়ে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানান ধর্মমন্ত্রী। গাকা থেকে প্রত্যাশিত অনুমোদন মেলে, কেটে যায় আরেকটি সংকট। নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও বিমানের টিকিট ইস্যুর কাজ।
মিনা ও আরাফায় তাঁবু হারিয়ে ফেলা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেকোনো হাজীর ক্ষেত্রেই এটি ঘটতে পারে। একবার তাঁবু হারিয়ে ফেললে খুঁজে পেতে কিছুটা হলেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তাঁবু খুঁজে পেতে সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল বাঁধা ভাষা। বেশিরভাগ সৌদি পুলিশ তাদের মাতৃভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বোঝেন না। ‘নুসুক’ কার্ডে লোকেশন ট্র্যাকিং করার সুযোগ থাকলেও আরবি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা না জানার কারণে পুলিশের দিকনির্দেশনা বোধগম্য করা সম্ভব হয় না। এ সমস্যা দূরীকরণে ‘লাব্বাইক’ অ্যাপে মিনা ও আরাফার তাঁবুসমূহকে হজ এজেন্সির নাম ও জোনভিত্তিক বিন্যস্ত করে মক্তব ও খুঁটি নম্বরসহ গুগল ম্যাপে ট্র্যাকিং করার জন্য ‘আইকমিউ’ অ্যাপ চালু করা হয়। এই অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো হাজী লোকেশন ট্র্যাকিং করে তার তাঁবুতে পৌঁছে যেতে পেরেছে। এবছর সরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদের মক্কা ও মদিনার হোটেলও ট্রাকিং করারও ব্যবস্থা ছিলো এই অ্যাপে।
এবছর হজযাত্রা সহজ ও মসৃন করার লক্ষ্যে রাজধানীর আশকোনাস্থ সরকারি হজক্যাম্পে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা সংযোজন করা হয়। হজযাত্রীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ হতে হজক্যাম্পে এক লক্ষ বোতল মিনারেল ওয়াটার সরবরাহ করা হয়। হজযাত্রীদের রিসিপশনে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান স্কাউটস ও আনজুমান–ই- খাদেমুল হজের পাশাপাশি নিযুক্ত করা হয় অতিরিক্ত জনবল।
হজযাত্রীদের আবাসন ও খাবারের সুবন্দোবস্ত করা হয়। হজক্যাম্পের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য নিযুক্ত করা হয় পেশাদার লোকবল। নারী হজযাত্রীদের জন্য এবছর ওযুখানাসহ পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া, হজযাত্রীদের সাথে আগত ব্যক্তিদের জন্য হজক্যাম্পের উত্তর-পূর্ব পাশে টয়লেট স্থাপন করা হয়।
এবছর সৌদি পর্বের হজ ব্যবস্থাপনা ছিলো সুপরিকল্পিত, সুবিন্যস্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। সৌদি সরকার এবারের হজ ব্যবস্থাপনাকে নিরাপত্তা, ব্যবস্থাপনা ও পরিষেবার একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। হজ পালন ও মক্কা-মদিনাসহ পবিত্র স্থানসমূহে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, তীব্র গরমে সচেতনতামূলক, প্রতিরোধমূলক ও প্রতিকারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা প্রভৃতির মাধ্যমে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে নিরলস কাজ করেছে সৌদি সরকার। এরূপ নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে হজযাত্রীরা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে হজ পালন করতে পেরেছে।
হজ ব্যবস্থাপনা একটি সম্মিলিত প্রয়াস। এ প্রয়াসের সাথে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), ঢাকা হজ অফিস, জেদ্দার বাংলাদেশ হজ মিশন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, সাউদিয়া ও ফ্লাইনাস, হজ এজেন্সি ও হাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এছাড়া, হজ ব্যবস্থাপনার নীতিনির্ধারণী বিষয়সহ সৌদি প্রান্তের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে সৌদি সরকার। হজ ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের দায়িত্বশীল ভূমিকা, কর্মনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও আন্তরিকতা ব্যতীত সুষ্ঠু ও সুন্দর হজ ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। এবছর হজযাত্রীদের সেবায় সরকারের অদম্য প্রত্যয়, নিরলস সেবা ও নিবিড় মনিটরিং হজ ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং হজ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তত্ত্বাবধান করেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। অন্যদিকে ধর্মমন্ত্রী হজ ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক বিষয় সশরীরে নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন। তিনি হজক্যাম্পে গভীর রাত অবধি অবস্থান করে হজযাত্রা সহজ ও মসৃণ করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। উদ্ভূত যেকোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়েছেন। সৌদিতে আসার পরও তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন। মিনার তাঁবুতে তাঁবুতে ঘুরে হজযাত্রীদের খোঁজ নিয়েছেন। সরকারের নানা উদ্যোগ ও নিরলস প্রচেষ্টায় এবছরের হজ ব্যবস্থাপনা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
#লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST