সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়। এই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তারই ফলশ্রুতিতে প্রণীত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে দেশের সকল রাজনৈতিক দল, জোট ও গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিনিধিদের পারস্পরিক ও সম্মিলিত আলোচনার মাধ্যমে এই সনদ প্রস্তুত করা হয়। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে গৃহীত এসব সংস্কার প্রস্তাবেই জাতীয় ঐকমত্য প্রতিফলিত হয়েছে।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে ভোটাররা দুটি পৃথক ভোট প্রদান করবেন—একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি গণভোট। সংসদ নির্বাচনে আগামী পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যাকে দিতে চান, তাকে ভোটাররা সাদা রঙের ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান করবেন। অন্যদিকে, গণভোটের জন্য গোলাপি রঙের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের অভিপ্রায় ব্যক্ত করবেন।
গণভোটে নিম্নরূপ একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে- “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?; (ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে। (খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে। (গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে”।
জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হওয়া ৩০টি বিষয়ে নাগরিকদের পরিপূর্ণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই ধারণা ভোটারদেরকে সংবিধান সংস্কারের গুরুত্ব এবং প্রতিটি প্রস্তাবের প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝাপড়া দিতে সহায়তা করবে। এতে গণভোটে অংশগ্রহণকারী নাগরিকরা এই তথ্যের ভিত্তিতে দেশের গণতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের পক্ষে বা বিপক্ষে যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংস্কারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্রভাষা ও নাগরিক পরিচয় সংক্রান্ত। বাংলা হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহৃত অন্যান্য সকল ভাষাকে দেশের প্রচলিত ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে।পাশাপাশি, নাগরিকদের পরিচয় “বাংলাদেশি” হিসেবে নির্ধারণ করা হবে। এই সংস্কারটি দেশের সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দেয় এবং ভাষার ভিত্তিতে বিভাজন ও বৈষম্য রোধ করে। সংবিধানে নাগরিক পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হবে।
সংবিধান বিলুপ্ত করা, স্থগিত করা বা অনির্ধারিতভাবে সংশোধনের অপরাধের বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক ও ৭খ বিলুপ্ত করা হবে। এর মাধ্যমে কোনও সরকার বা ব্যক্তি সংবিধানকে নিজের স্বার্থে বিকৃত করতে পারবে না। এটি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং সংবিধানকে সর্বাধিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
জুলাই জাতীয় সনদে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান সংস্কার করা হয়েছে। ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’ শব্দের পরিবর্তে ‘রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ সংযোজন করা হবে। এছাড়া, নাগরিকদের জীবনের অধিকার ও বিচার ও দন্ড সম্পর্কিত মৌলিক অধিকার অপরিবর্তনীয় থাকবে। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা বা তার অনুপস্থিতিতে উপনেতার উপস্থিতি আবশ্যক হবে।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ দশ বছর থাকতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি, রাজনৈতিক বা অন্যান্য পদে থাকা যাবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্তের পরিবারের সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। এটি রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করবে।
ভবিষ্যতের জাতীয় সংসদ দুই কক্ষ বিশিষ্ট হবে। উচ্চকক্ষে নির্বাচিত ১০০ সদস্য থাকবেন এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। এই কাঠামো গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখবে এবং সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়াকে জবাবদিহিমূলক করবে। জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে ১০০ আসনে উন্নীত হবে। সংরক্ষিত নারী আসন ২৫ বছর পর্যন্ত বহাল থাকবে। সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো প্রথমে ৫% এবং পরবর্তী নির্বাচনে ধাপে ধাপে ৩৩% নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করবে। এটি সমান অংশগ্রহণ ও নারী ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ডেপুটি স্পীকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়ন বাধ্যতামূলক। জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব, প্রিভিলেজ, অনুমিত হিসাব ও অন্যান্য কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলের সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এটি সংবিধান ও নির্বাচনি ব্যবস্থায় সমতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। প্রতি দশ বছর পর নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের জন্য একটি অস্থায়ী বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হবে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হবে। এতে ভোটারের প্রতিনিধিত্ব আরও সঠিকভাবে নিশ্চিত করা হবে।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুপ্রীম কোর্ট ও জেলা ইউনিটে স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করা হবে। বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রীম কোর্টের অধীনে থাকবে। এটি বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও স্বতন্ত্রতা নিশ্চিত করে। প্রধান বিচারপতি আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি হবেন। চলমান তদন্তাধীন বিচারক প্রধান বিচারপতি হতে পারবেন না। আপীল বিভাগের বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে এবং প্রধান বিচারপতি প্রয়ো জন অনুযায়ী নিয়োগ দেবেন। এটি বিচার বিভাগকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সুপ্রীম কোর্ট ও জেলা ইউনিটের সমন্বয়ে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করা হবে। এটি প্রক্রিয়াজাত, স্বচ্ছ ও দক্ষ সরকারি আইনজীবী পরিষেবা নিশ্চিত করবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগ স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় হবে। নির্বাচনী বাছাই কমিটিতে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি থাকবেন। কমিশনারদের ৫ বছরের মেয়াদ থাকবে। স্পিকারের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সংসদ সচিবালয় সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে। জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের জবাবদিহিতার বিধান রাখবে। এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের অধীনে ব্যবস্থা থাকবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিজের তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে। তবে বাজেট আইনসভার উচ্চকক্ষে পাঠানো আবশ্যক, যদি প্রাক্কলিত তহবিল কম হয়। এটি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা করবে যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থে সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতা ব্যবহার করা যাবে না। অনুপার্জিত আয় ভোগ করা যাবে না। এটি নাগরিক অধিকার ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারিত ও সুরক্ষিত হবে। বাংলাদেশ বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ হিসেবে চিহ্নিত হবে। সকল সম্প্রদায়ের মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদে যে বিষয়গুলোতে জাতীয় ঐক্যমত্য হয়েছে, তা নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সনদে অন্তর্ভুক্ত সংস্কারগুলো দেশের সংবিধান, নির্বাচন, বিচার, জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও জবাবদিহিমূলক করার লক্ষ্য রাখে। সনদে প্রতিফলিত ঐক্যমত্যের বিষয়গুলো নাগরিকদেরকে স্পষ্ট ধারণা দেয় যে, কোন সংস্কারগুলো সমগ্র রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেয়েছে এবং গণভোটে এই সংস্কারের পক্ষে ভোট দেওয়ার যৌক্তিকতা কী। এর ফলে ভোটাররা সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংবিধান সংস্কারের প্রভাব, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।
আসন্ন গণভোট কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। গণভোটে ভোট প্রদান মানে কেবল একটি মতামত প্রকাশ নয় বরং একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সংস্কারমুখী রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। তাই দেশ ও জাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত দায়িত্বশীলভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা এবং গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সক্রিয় অংশীদার হওয়া। দেশের ভবিষ্যৎ, সুশাসন এবং অপশাসন থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদান করা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও সুদৃঢ় ও গতিশীল করবে।
লেখকঃ মো. খালিদ হাসান
সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর
(পিআইডি ফিচার)
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST