
মুহা: আব্দুল আউয়াল : বর্তমানে বাংলাদেশে নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংকট এখন কেবল সামাজিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নগরায়ণের পাশাপাশি সমাজে বেড়েছে ভোগবাদ, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি, প্রতারণা ও পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা। ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাহ্যিকভাবে বাড়লেও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রেই এক ধরনের নৈতিক সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
একসময় বাংলাদেশের সমাজ পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা, মানবিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল মানুষের জীবনের অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই মূল্যবোধে ধীরে ধীরে ভাটা পড়েছে। এখন অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় মানুষ অনেক সময় নৈতিকতা ও বিবেককে উপেক্ষা করছে। সমাজে দুর্নীতি, ঘুষ, মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন, প্রতারণা, অনলাইন অপরাধ, কিশোর গ্যাং ও সহিংসতা বাড়ার পেছনে এই নৈতিক অবক্ষয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। সারা দেশে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ধর্ম মানুষকে সত্যবাদিতা, সহনশীলতা, মানবপ্রেম ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পরকালীন জীবনে শান্তি, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের শিক্ষা দেয়। বিশ্বের অন্যান্য ধর্মও মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কেউ কেউ ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে, যা ধর্মের মূল আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেও অনেকে বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ করছেন না। ফলে নামাজ, রোজা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন বাড়লেও সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার মতো মৌলিক গুণাবলির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হলো পরিবারব্যবস্থার দুর্বলতা। একসময় যৌথ পরিবারে শিশুরা দাদা-দাদি, নানা-নানি ও অভিভাবকদের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা পেত। এখন নগরজীবন, ব্যস্ততা ও একক পরিবারব্যবস্থার কারণে সেই পরিবেশ কমে গেছে। বাবা-মা অনেক সময় সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না। ফলে শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইন্টারনেট ও ভার্চুয়াল জগত থেকে জীবনদর্শন শিখছে, যেখানে ইতিবাচকের পাশাপাশি নেতিবাচক প্রভাবও প্রবল।
শিক্ষাব্যবস্থাতেও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে। পরীক্ষাভিত্তিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল অর্জনই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, সততা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও নৈতিকভাবে উন্নত নাগরিক তৈরি হচ্ছে না।
মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও নৈতিক অবক্ষয়ের একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে অনেক কনটেন্টে অশালীনতা, সহিংসতা, মিথ্যা তথ্য ও ভোগবাদী জীবনধারা প্রচার করা হয়। তরুণ সমাজ এগুলোর দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইন আসক্তি, পর্নোগ্রাফি ও অস্বাস্থ্যকর বিনোদন কিশোর-তরুণদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বেকারত্বও নৈতিক সংকটকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন একজন তরুণ দীর্ঘদিন চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভোগেন, তখন অনেকেই অবৈধ পথ বেছে নিতে প্রলুব্ধ হন। আবার সমাজে যখন অসৎ উপায়ে ধনী হওয়া মানুষদের প্রভাব ও মর্যাদা বাড়তে দেখা যায়, তখন তরুণদের একটি অংশ মনে করে সততা দিয়ে সফল হওয়া কঠিন। এ ধরনের সামাজিক বাস্তবতা নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
রাজনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রেও নৈতিকতার ঘাটতি জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ ও অনৈতিক প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন জনগণ দেখে অপরাধ করেও অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন সমাজে আইনের শাসন ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়।
তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও রয়েছে। প্রথমত: পরিবার থেকেই নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে মানবিকতা, সততা ও শিষ্টাচার শেখানোও জরুরি। বাবা-মাকে নিজেদের আচরণের মাধ্যমেই সন্তানদের সামনে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত: শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু বইয়ের পাতায় নীতিকথা থাকলেই হবে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাস্তবভিত্তিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী নয়, আদর্শ মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ববোধ বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত: ধর্মীয় শিক্ষা ও চর্চাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মানবিক ও নৈতিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। সব ধর্মই মানুষকে শান্তি, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মীয় নেতাদেরও বিভেদ নয়, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।
চতুর্থত: মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। ইতিবাচক ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট বাড়ানো, ভুয়া তথ্য ও অশ্লীলতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং তরুণদের সচেতন করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারকেও সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রমের প্রতি নজর দিতে হবে।
পঞ্চমত: রাষ্ট্রকে আইনের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। সমাজে যদি সৎ মানুষ মর্যাদা পায় এবং অপরাধীরা দ্রুত শাস্তির মুখোমুখি হয়, তবে নৈতিকতার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈষম্য কমানোর উদ্যোগও সামাজিক স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করবে।
নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও রাতারাতি সম্ভব নয়। এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, তবে নিজের সংস্কৃতি, মানবিকতা ও নৈতিক ভিত্তি হারিয়ে নয়। কারণ নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাড়া উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। একটি সত্যিকারের উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)। #
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST