
স্টাফ রিপোর্টার : মধু মাস জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই রাজশাহী ও আশপাশের বাজার ভরে উঠেছে মৌসুমী ফল আম ও লিচুতে। এসব আম-লিচু ঢাকায় পাঠাতে কয়েক বছর ধরে ঢাকামুখী ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন’ থাকলেও এবছর তা অনিশ্চিত। এছাড়াও কোরবানি ইদের আগে চলা ক্যাটল স্পেশাল ট্রেনও এবার আর চলছে না। পশ্চিম রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহের অভাবের পাশাপাশি গত কয়েক বছরের আর্থিক লোকসানও এবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
টানা পাঁচ বছর চলেছিল ম্যাংগো ও ক্যাটেল স্পেশাল ট্রেন। এতে রেলওয়ের লাভের তুলনায় লোকসান হয়েছিল দ্বিগুন। তবে এবার আম ও পশু পরিবহনে স্পেশাল ট্রেন চালু করছে না পশ্চিমাঞ্চল রেল। আয়ের চেয়ে ট্রেন পরিচালনা ব্যয় হয় দ্বিগুণেরও বেশি। এতে রেলের লোকসান হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। রেলের স্পেশাল সেবা নিতে আম বাগানি, খামারি ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ এবং মোটা অংকের টাকা লোকসানের কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল বিভাগ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমের ভরা মৌসুম ও কোরবানির ইদে চলে স্পেশাল ট্রেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে ঢাকা পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ঘটা করে চালু করেছিল ম্যাংগো স্পেশাল ও ক্যাটেল স্পেশাল ট্রেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক বাগানি ও খামারিদের উৎপাদিত পণ্য কম খরচে রাজধানীতে পৌঁছে দেয়া। কাগজে-কলমে সেই উদ্যোগ যতটা কার্যকরি ছিল, বাস্তব চিত্র ছিল ঠিক তার উল্টো।
বাগান বা বাড়ি থেকে স্টেশন পর্যন্ত, আবার স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে আম বা পশু নেয়ার ক্ষেত্রে পোহাতে হতো ঝক্কি-ঝামেলা। হতো বাড়তি খরচ। সে কারণে ট্রেনের চেয়ে সড়কেই বেশি আস্থা রেখেছেন বাগানি ও খামাররিা। ফলে রেলওয়ের এই স্পেশাল সার্ভিসের ট্রেনগুলো ফাঁকা যাতায়াত করতো।
গত পাঁচ বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতি কেজি আম এক টাকা ৪৭ পয়সা এবং রাজশাহী থেকে এক টাকা ৪৩ পয়সা ভাড়ায় ট্রেনে করে ঢাকায় আম নিয়ে যেতেন কৃষকরা। একইভাবে ইদুল আজহায় স্বল্প খরচে কোরবানির পশু পরিবহনের জন্য ট্রেন চালু করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে ক্যাটল ট্রেন আলাদাভাবে চালু করা না হলেও ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনের দুটি ওয়াগনে পরিবহন করা হয় কোরবানির পশু।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেনে আয় হয়েছে ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৬ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০২১ সালে আয় হয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজার ৯২৮ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৫৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ২০২২ সালে আয় হয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ১৭৪ টাকা। আর ব্যয় ১২ লাখ ৪০ টাকা। ২০২৩ সালে আয় হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫০২ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা। যদিও ২০২৪ সালে শুধু ক্যাটেল স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়েছিল। দুদিন চালানোর পর তা আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত ৫ বছরে স্পেশাল এসব ট্রেন থেকে রেলওয়ে আয় করেছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এর বিপরীতে জ্বালানি তেল, স্টাফদের বেতন ও অন্যান্য ব্যয় প্রায় দুই কোটি টাকা। আম ও কোরবানির পশু পরিবহনে রেলওয়ের লোকসান প্রায় দেড় কোটি টাকা।
এ বিষয়ে রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, লাভ-লোকসানের বিষয় নয় এটি। চাষি, ব্যবসায়ী ও খামারিদের স্বার্থে এই ট্রেন চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পণ্য স্টেশনে নিয়ে যাওয়া, ট্রেনে তোলা, ঢাকায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া; সব মিলিয়ে বাড়তি ব্যয় হতো। আসলে এই উদ্যোগ খুব বেশি পরিকল্পনা করে নেয়া হয়নি। সেসময় রেল বিভাগ ব্যবসায়ীদের এ নিয়ে আলোচনাও করেনি। ফলে এটি ফলপ্রসূ হয়নি।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, আম বাগানি ও খামারিদের অনীহা এবং বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতির কারণে এবার স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে আগে প্রচারণা চালিয়ে এরপর চালুর করা যেতে পারে। তবে তা সময়সাপেক্ষ।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST