স্টাফ রিপোর্টার : তাপপ্রবাহ, খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় শীতলীকরণ এখন আর বিলাসিতা নয়; জনস্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শীতলীকরণের চাহিদা মেটাতে শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ালে চলবে না। জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পাশাপাশি বৃক্ষ, জলাশয় ও সবুজ এলাকার মতো প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব ওজোন দিবস উপলক্ষে রাজশাহীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বুধবার বারসিকের রাজশাহী আঞ্চলিক রিসোর্স সেন্টারে বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম, গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশনের যৌথ উদ্যোগে এ সভা হয়। সভার বিষয় ছিল ‘শীতলতর গ্রহের জন্য বৈশ্বিক পদক্ষেপ: টেকসই শীতলীকরণ ও বরেন্দ্রের ভবিষ্যৎ’ এবং ‘ওজোনস্তর রক্ষায় যুব অঙ্গীকার’।
সভায় বিশ্ব ওজোন দিবসের প্রেক্ষাপট, ওজোনস্তর রক্ষায় বৈশ্বিক উদ্যোগ, বাংলাদেশের অবস্থান এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে টেকসই শীতলীকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পলি রানী।
বক্তারা বলেন, ১৯৮৭ সালের মন্ট্রিয়ল প্রটোকল ওজোনস্তর রক্ষায় বৈশ্বিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে কিগালি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। এতে উচ্চ বৈশ্বিক উষ্ণায়নক্ষমতাসম্পন্ন এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে ওজোনস্তর সুরক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বিষয়টিও শীতলীকরণ খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন একদিকে ওজোনস্তর সুরক্ষায় বিশ্ব উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে শীতলীকরণের প্রয়োজনও বাড়ছে। এমন শীতলীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করবে, কিন্তু পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে না।’
বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উচ্চ তাপমাত্রা, তাপপ্রবাহ, খরা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং কৃষিনির্ভর জীবিকার ঝুঁকি এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই বরেন্দ্রের শীতলীকরণ নীতি শুধু ঘরের তাপমাত্রা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পুকুর, জলাশয়, বৃক্ষ, ছায়া, সবুজ এলাকা, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও তাপ-সহনশীল ভবনকে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’
আদিবাসী যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাবিত্রী হেমব্রম বলেন, ‘শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। ওজোনস্তর সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং সবার জন্য নিরাপদ শীতলতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
আলোচনায় আমার বাংলা তরুণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক তাহমিদ জাকি, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের প্রচার সম্পাদক হাসিবুল হাসনাত রিজভি, নবজাগরণ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য মো. মোস্তাকিম সরদারসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভা থেকে ওজোনস্তর সুরক্ষা ও টেকসই শীতলীকরণ নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতি ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে উচ্চ উষ্ণায়নক্ষমতাসম্পন্ন শীতলীকরণ গ্যাসের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার, নতুন শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন যন্ত্রে জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত, পুরোনো যন্ত্র থেকে গ্যাস পুনরুদ্ধার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও সনদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য ‘জলবায়ু-স্মার্ট বরেন্দ্র শীতলীকরণ’ নামে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণেরও প্রস্তাব করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার ও কমিউনিটি ভবনে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ, সবুজায়ন, ছাদ ব্যবস্থাপনা ও শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের কথা বলা হয়।
বক্তারা বলেন, বরেন্দ্রের পুকুর, জলাশয়, খাল, বৃক্ষ ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ জরুরি। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু পানি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাপপ্রবাহের সময় শিশু, প্রবীণ, শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বানও জানানো হয়।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST