১৬ মে ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

গণভোটের রায় অস্বীকার করা যাবে না, জনগণকে এখনো বলুন আমরা মানছি : রাজশাহীতে ডা. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি

মঈন উদ্দিন : জনগণের ৭০ শতাংশ রায়কে অস্বীকার করা যাবে না। এখনো সময় আছে এসে বলুন, আমরা জনগণের রায় মেনে নিচ্ছি। তাহলে জনগণ আপনাদের ক্ষমা করবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি রাজশাহীতে ১১ দলীয় ঐক্য জোটের রাজশাহী বিভাগীয় জনসভায় এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা জাতিকে ধোকা দিয়েছেন এবং ইতিমধ্যে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অতীতে কেউ কোনদিন রেহাই পায়নি, আপনারাও রেহাই পাবেন না। তাই সৎপথে ফিরে আসুন। জাতির সাথে গাদ্দারি-বেঈমানি করবেন না।’
সমাবেশ থেকে তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায়ও বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হবে। বাস্তবায়ন করতে বাধ্য করা হবে, ইনশাআল্লাহ। গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। নইলে দেশে অতীতের চেয়ে ভয়াবহ স্বৈরশাসন জাতির ঘাড়ে চেপে বসবে।
তিনি বলেন, ‘এটি সঠিক, সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধ আমরা যারা বিরোধী দলে ছিলাম দফায় দফায় আন্দোলন করেছি। কিন্তু আমাদের আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিবাদীরা পালিয়ে যায়নি। যেদিন এই তরুণ-তরুণীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এসেছিল, জনগণ তাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। সকলে রাস্তায় নেমে এসেছিল। আন্দোলন সেদিনই সফলতার মুখ দেখেছিল। এখন সরকারি দলের বন্ধুরা তাদের কাউকে বলে শিশু পার্টি, আর কাউকে বলে গুপ্ত। লজ্জা। যাদের কারণে আপনাদের এই গদি, তাদের আপনারা উপহাস করছেন। এর পাওনা বুঝে নেওয়ার জন্য তৈরি হোন। এই জাতি ঠিকই পাওনা বুঝিয়ে দেবে আপনাদের।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা সব বিষয়ে কথা বলব। সংসদে কথা বলতে অনুমতি লাগে। যদি সংসদে কথা বলতে দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা ওখানে চলে আসব যেখানে কথা বলতে কারও অনুমতি লাগবে না। আমরা তখন জনগণের পার্লামেন্টে চলে আসব।’
জামায়াতের আমীর বলেন, যাদের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আজ সংসদ ও গণভোট সম্ভব হয়েছে, তাদেরই এখন অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। তরুণদের আত্মত্যাগের ফলেই দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ ক্ষমতায় বসবে না। অথচ এখন ৪৭ জেলায় প্রশাসক বসানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা গুম কমিশন চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনারাও স্বৈরাচারী পথেই হাঁটছেন।
তিনি বলেন, ভালো কাজ করলে আমরা পানির মতো তরল থাকবো, আর অন্যায় করলে ইস্পাতের মতো কঠোর হবো। আপনারা চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন সমঝোতার নামে চাঁদাবাজি বৈধ করা হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী দল আজ চাঁদাবাজ দলে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সবখানে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে। সংসদে কথা বলতে না দিলে আমরা রাজপথে কথা বলবো। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসতে পারে, তারা কোনো হুমকিকে ভয় পায় না।
ভারতে মুসলমানদের নির্যাতন করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ আমাদের প্রতিবেশী। প্রতিবেশীকে সম্মান করি। আমরা চাই, আপনারা শান্তিতে থাকুন। আমরা চাই আপনাদের দেশের ভেতরে মানবিক পরিবেশ তৈরি হোক। আমরা চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন এবং অশান্তি হোক। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেখানে শুধু মুসলিম নামের মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। বন্ধু, এটা তিতুমীরের বাংলাদেশ। হাজি শরীয়তউল্লাহর বাংলাদেশ। শাহমখদুমের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না। হুমকি-ধমকি দিবেন না।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পদ্মা ও তিস্তার বিশাল অংশ আজ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদীকে তার যৌবন ফিরিয়ে দিতে হবে।
শেষে তিনি বলেন, আমরা ভালো কাজের পক্ষে সবসময় থাকবো। কিন্তু অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করবো। জনগণের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। আমরা জীবন দিতে পারি, কিন্তু দেশের মর্যাদা বিকিয়ে দেবো না।
সমাবেশে উপস্থিত অন্যান্য নেতারাও সমানভাবে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তারা দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এবং পূর্ববর্তী গণআন্দোলনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন চলবে। তিনি দাবি করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে জনগণের ভোট নিয়ে কারচুপি করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসন গভীর সংকটে রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রধান বলেন, ফারাক্কা ইস্যুতে অতীতের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পদ্মা নদীর পানি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, গোপন সমঝোতার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বলেন, জনগণ এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝে গেছে। তিনি সরকারের প্রতি জনগণের দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, গণভোটে জনগণ হ্যাঁ” ভোট দিলেও তা বাস্তবায়নে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমীর মাওলানা আব্দুল কাইউম সুবহানী বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে। তিনি ১১ দলীয় ঐক্যকে আন্দোলনে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় নারী শক্তির আহবায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ৫ আগস্টের পর যারা জনগণের পক্ষে কথা বলেছিল, তারা এখন জনগণের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হচ্ছে এবং জনগণের রায়কে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এতো সহজে আমরা বিএনপি সরকারকে ভুলে যেতে দেবো না। এই দেশ স্বাধীন করতে আমরাও সংগ্রাম করেছি। ফ্যাসিস্ট সরকার হটাতে আমাদের ঐক্য ছিল, এখনো সেই ঐক্য প্রয়োজন। অন্যদিকে পদ্মার পানি শুকিয়ে রাজশাহী মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা আরেকটি দেশের হাতে আমাদের নদী তুলে দিতে পারি না। ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বলবো আবারও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে।
খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমীর অধ্যাপক সিরাজুল হক বলেন, দলীয়করণ ও অযোগ্যদের পদায়ন রাষ্ট্রকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠন এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চল মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, জনগণ পরিবর্তনের আশায় ভোট দিলেও এখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি সীমান্ত হত্যা, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় তুলে ধরে বলেন, সরকার জনগণের সরকার কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তিনি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন বলেন, রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। তিনি বলেন, পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনিক বৈষম্য ও উন্নয়ন বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানান।
সমাবেশের সভাপতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, জনগণের রায়কে অস্বীকার করা হলে তা রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়াবে। তিনি বলেন, গণভোটের ফলাফলকে সম্মান জানানো সরকারের দায়িত্ব।
সমাবেশে বিভিন্ন জেলা ও কেন্দ্র থেকে আগত রাজনৈতিক নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে ঘোষণা দেন, জনগণের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গণআন্দোলন অব্যাহত থাকবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও স্থানীয় নেতারা অংশ নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক নিয়োগ, সীমান্ত পরিস্থিতি, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, চাঁদাবাজির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অধিকার ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেন।
এসময়বক্তারা বলেন, পদ্মা ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, চাঁদাবাজি দমন এবং প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা ফিরবে না। তারা সতর্ক করে বলেন, জনগণের রায় বাস্তবায়নে দেরি হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতীয় ঐকমত্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চলচ্চিত্র শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া হবে : তথ্যমন্ত্রী

রাজশাহী কোর্ট কলেজে নবীনবরণ, বিদায় ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

চামড়া দেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত : শিল্পমন্ত্রী

রাজশাহীতে স্পোর্টস সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় হবে : ভূমিমন্ত্রী মিনু

দেশ পুনর্গঠনই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা : প্রধানমর্ন্ত্রী

গণভোটের রায় অস্বীকার করা যাবে না, জনগণকে এখনো বলুন আমরা মানছি : রাজশাহীতে ডা. শফিকুর রহমান

ভাঙ্গায় সাংবাদিকদের সাথে উপজেলা উন্নয়ন নাগরিক ফোরামের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত

হারানো ঐতিহ্য ‘রাজশাহী সিল্ক’ পুনরুদ্ধারে ব্র্যাকের অংশগ্রহণ চান ভূমি মন্ত্রী মিনু

রাজশাহী বিভাগে ইন্টারনেট সেবায় নতুন সম্ভাবনার আশা

খাল খনন কাজ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক চারঘাটে

১০

তিন দিনের সফরে রাজশাহী আসছেন ভূমিমন্ত্রী

১১

গণভোট বাস্তবায়ন, পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা ও জনদুর্ভোগ লাঘবের দাবিতে ১৬ মে রাজশাহীতে সমাবেশ

১২

রাজশাহীতে খাল খননে প্রায় ৫০ শতাংশ অগ্রগতি : জেলা প্রশাসক

১৩

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ খরচ ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা

১৪

রামেবি ও সড়ক উন্নয়নে জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ পেলেন ১২ মালিক

১৫

তিন লক্ষ তিরাশি হাজার ডোজ পোলিও টিকা দিয়েছে ‘সিনোভ্যাক ফাউন্ডেশন’

১৬

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আগামী দুই বছর সামাজিক স্থিতিশীলতা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী

১৭

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সাথে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

১৮

তানোরে তেরো বছরেও পাকা হয়নি শিবনদী সেতুর সংযোগ সড়ক

১৯

উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল : তথ্য প্রতিমন্ত্রী

২০

Design & Developed by: BD IT HOST