
স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী নগরের ভূমিহীন ও নিম্ন আয়ের বস্তিবাসীদের আবাসনের অধিকার নিশ্চিত, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ এবং মানবিক নগর গঠনের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২৬ রাজশাহী নগরের সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে এক মানববন্ধন ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
নামোভদ্রা লেকপাড় বাস্তুহারা সার্বিক উন্নয়ন সংগঠন, গ্রীন কোয়ালিশন ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের যৌথ আয়োজিত কর্মসূচিতে নাগরিক সমাজ, বস্তিবাসী, মানবাধিকারকর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা বলেন, রাজশাহী শহরের নামোভদ্রা লেকপাড়সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় ১০৪টি বস্তি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী হাজারো পরিবার উচ্ছেদের অনিশ্চয়তায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। এদের অধিকাংশই রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও দিনমজুর যাদের শ্রমেই নগরের অর্থনীতি সচল থাকে। অথচ তারাই আজ নিরাপদ আবাসনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
বক্তারা আরও বলেন, আবাসন কেবল একটি সামাজিক চাহিদা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর আলোকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।
নামোভদ্রা বাস্তুহারা সার্বিক উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি বাচ্চু মিয়া বলেন, “আমরা দখলদার নই, আমরা এই শহরের শ্রমজীবী মানুষ। আমাদের ঘামেই রাজশাহীর চাকা ঘোরে। কিন্তু আজ মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও হারানোর ভয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকতে হয়। আমরা উচ্ছেদ চাই না, আমরা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার অধিকার চাই।”
নামোভদ্রা বস্তিবাসী জেসমিন খাতুন বলেন, “আমরা বাংলাদেশের সরকার তারেক রহমানের কাছে জানাই আমদের উচ্ছেদ করার আগে আমাদের বসতবাড়ি দেন। রোহিঙ্গারা যদি এদেশে থাকার জায়গা পায় তাহলে আমরা এদেশের নাগরিক আমরা কেন পাবো না।”
জামালপুর বস্তিবাসী খলিল হোসেন বলেন, “আমরা নদী ভাঙ্গনের ফলে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। এই শহরের নোংরা বোতল, পলিথিন, ময়লা ইত্যাদি আমরা সংগ্রহ করি। শহরকে পরিস্কার-পরিছন্ন করি আমরা কিন্তু আমাদের থাকার জায়গা নেই।”
নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও জামালপুর বস্তিবাসী নিলুফা ইসমত আরা বলেন, “একটি ঘর হারানো মানে শুধু একটি ঠিকানা হারানো নয়; হারিয়ে যায় সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের নিরাপত্তা, জীবিকার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সরকার আমাদের অপরাধী নয়, নাগরিক হিসেবে দেখুক। নির্বাচনের সময় আমরাও ভোট দেই, আমরা আমাদের অধিকার চাই।”
বহরমপুর বস্তিবাসী মতি মিয়া বলেন, “বছরের পর বছর ধরে আমরা এই শহরে কাজ করছি, আমার রান্না না করলে আপনাদের রান্না হবে না, ঘর পরিস্কার হবে না অথচ আমাদের কাজের, অস্তিত্বের কোনো স্বীকৃতি নেই। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা যেন উচ্ছেদের ভয়ে নয়, নিরাপদ একটি ঘরে থেকে ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।”
গ্রীণ কোয়ালিশন রাজশাহীর সভাপতি, মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “একটি সভ্য নগর কখনো তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের উচ্ছেদ করে উন্নয়নের গল্প লিখতে পারে না। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও নগরায়ণের এই সময়ে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের অন্যতম পূর্বশর্ত। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিরও পরিপন্থী।”
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি, মো. আতিকুর রহমান বলেন, “রাজশাহীকে যদি সত্যিকার অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও টেকসই এবং জলবায়ু সহনশীল নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং এই জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষগুলোর কথাও বিবেচনা করতে হবে। আমরা এমন কোনো উন্নয়ন চাই না, যা দরিদ্র মানুষের মাথার ওপরের ছাদ কেড়ে নেয়। পুনর্বাসন নিশ্চিত করেই উন্নয়ন করতে হবে, এটাই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
নৃবিজ্ঞানী ও গ্রীন কোয়ালিশন রাজশাহীর সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, জোরপূর্বক উচ্ছেদ দারিদ্র্যকে আরও গভীর করে, সামাজিক বৈষম্য বাড়ায় এবং শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় বস্তিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পুনর্বাসনকে আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। নিরাপদ আবাসন কোনো দয়া নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার।”
তিনি আরো বলেন, “ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন সময়ে নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য আবাসন প্রকল্প নেয়া হয়েছে এবং নেয়া হচ্ছে কিন্তু রাজশাহী শহরে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হলেও এই নগর দরিদ্র, জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জন্য কোন আবাসন প্রকল্প নেয়া হয় নি।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার সুজন বলেন, “পুর্নবাসন ছাড়া কোন উচ্ছেদ করা যাবে না। বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এগুলো মানুষের মৌলিক অধিকার কিন্তু বস্তিবাসীরা এগুলোর কোনটাই তারা পায় না। তারা প্রচন্ড কষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করে। জনগণের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, নব্বই এর গণঅভ্যুত্থান এবং চব্বিশ এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে প্রত্যেকটা আন্দোলন সংগ্রামে জনগণ তাদের এই অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছে কিন্তু তাদের অধিকার হরণ হয়ে গিয়েছে, লুন্ঠন হয়ে গিয়েছে। আমরা এখন আর এটি দেখতে চাই না এই মানুষগুলোর আবাসন নিশ্চিত করেই উচ্ছেদ করা হোক।”
জুলাই-৩৬ পরিষদের আহ্বায়ক মাহমুদ জামাল কাদেরী মানববন্ধনের পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে রাজশাহীর কোনো বস্তি উচ্ছেদ করা যাবে না; সকল বস্তিবাসীর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব আবাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে; বস্তিবাসীদের পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে; উচ্ছেদসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করতে হবে; নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আবাসন অধিকারকে স্থানীয় ও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত বক্তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাজশাহীকে সত্যিকার অর্থে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু সহনশীল টেকসই নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কোন জনগোষ্ঠীকে পিছনে ফেলে নয়, সমতাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। মানুষকে আবাসনহীন করে উন্নয়ন নয়, বরং আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করেই উন্নয়ন হতে হবে।
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন, সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি গোপাল দেব শর্মাসহ প্রমূখ।
আয়োজকরা জানান, এই মানববন্ধনের পাশাপাশি গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সংগৃহীত গণস্বাক্ষর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ বন্ধ এবং নগর দরিদ্র মানুষের আবাসন অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST