৭ জানুয়ারী ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

বরেন্দ্র অঞ্চলে আট বছরে কমেছে ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি, বাড়ছে অবৈধ পুকুর খনন

মমিনুল ইসলাম মুন, স্টাফ রিপোর্টার : বরেন্দ্র অঞ্চলে দ্রুতগতিতে কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য কৃষিজমি। ফসলি জমি কেটে বাণিজ্যিক পুকুর খননের ফলে গত আট বছরে রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে। এতে কৃষি উৎপাদন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। একই সময়ে পুকুর, আবাসিক ভবন, রাস্তাঘাট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর ফলে কৃষিকাজের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে অভ্যন্তরীণ জলাভূমির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে। রাজশাহী জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ২৭৫টিতে, যা এক দশকে প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। সরকারি হিসাবের বাইরেও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত ও অবৈধ পুকুর খনন চলমান রয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৮৪ হাজার ৮০৩ টন, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ছিল ৫২ হাজার ৬৩ টন। এতে বাণিজ্যিক মাছচাষের ব্যাপক সম্প্রসারণের চিত্র ফুটে উঠছে।

অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। গত ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বারো পালশা গ্রামে অবৈধ পুকুর খননের প্রতিবাদে মধ্যরাতে হামলার শিকার হয়ে নিহত হন কৃষক আহমেদ জুবায়ের (২২)। এ ঘটনায় মামলা হলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দোষীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর খননের কাজে ব্যবহৃত এস্কেভেটর জব্দ ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আরও পড়ুনঃ   রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কৃষকদের মতে, রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া উচ্চফলনশীল জমির বড় অংশই বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তরিত হয়েছে, যা কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন ২০১৮ এবং মাটি সংরক্ষণ নির্দেশিকার পরিপন্থী। কৃষক ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।

কৃষক ও জমির মালিকদের দাবি, বেশি লাভের আশায় তারা ফসলি জমিতে পুকুর করতে বাধ্য হচ্ছেন। বোরো ধানের মতো ঐতিহ্যবাহী ফসলের তুলনায় মাছচাষে লাভ দ্রুত ও বেশি হওয়ায় এই প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় রাতের আঁধারে পুকুর খনন করা হচ্ছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ধান চাষ করে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। অথচ একই জমি পুকুর হিসেবে লিজ দিলে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। ফসলের দাম না পেলে ক্ষতি হয়, কিন্তু পুকুর লিজে সেই ঝুঁকি নেই।

গোদাগাড়ীর আরেকজন পুকুর মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাছচাষ থেকে ফসল উৎপাদনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভ পাওয়া যায়, মাসেও ভালো আয় সম্ভব।

বিধিমালা অনুযায়ী, ফসলি জমিতে পুকুর খননের জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমোদন প্রয়োজন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের যাচাই শেষে জমির উর্বরতা বিবেচনায় অনুমতি দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না, বেশিরভাগ পুকুর খনন করা হচ্ছে গোপনে ও রাতে।

আরও পড়ুনঃ   আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দেখামাত্র গ্রেপ্তার, না হলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজশাহী ছাড়াও নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবৈধ পুকুর খনন বেড়েছে। রাজশাহীর অনেক মাছ ব্যবসায়ী এখন পাশের জেলাগুলোতেও কম ইজারা খরচের সুযোগ নিয়ে পুকুর খনন করছেন। তিনি বলেন, বিলের মাঝখানে পুকুর খনন হলে আশপাশের জমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে, ফলে চাষাবাদ অসম্ভব হয়ে ওঠে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারে পুকুর খননের ফলে উর্বর টপসয়েল নষ্ট হচ্ছে, অনুর্বর মাটি ছড়িয়ে পড়ছে এবং জমি দীর্ঘমেয়াদে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অপরিকল্পিত খননে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, মাইক্রোক্লাইমেট পরিবর্তিত হচ্ছে এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল বাকি বরকতুল্লা বলেন, স্বল্পমেয়াদে অল্প কিছু মানুষের জন্য এটি লাভজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার জানান, কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপজেলা পর্যায়ের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পুকুর খননের অনুমোদন দেওয়া হয়। অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও রাতের অভিযান চলছে।

এদিকে রাজশাহীর তানোর উপজেলাতেও বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে ফসলি জমিতে পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এখানেও আবাদযোগ্য জমির বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

ইসলামাবাদে পাকিস্তান-ইরান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক

তথ্য অধিকার : সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নাগরিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি

পাবনাপাড়ায় ভূমিহীনদের পাশে রাসিক প্রশাসক

নগরীর ৪নং ওয়ার্ডবাসীর সমস্যা সমাধানে সরেজমিন পরিদর্শন ও মতবিনিময়ে রাসিক প্রশাসক

তানোরে সরকারি কলেজের জমি দখল করে পাকা দোকান নির্মাণের অভিযোগ

১৭নং ওয়ার্ড ক্রিকেট লীগের সিজন-৯ উদ্বোধন

রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া ও উজ্জীবিত করা হবে : রাসিক প্রশাসক

দরগা মসজিদ ও মাজারের উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে রাসিক প্রশাসক

দিনাজপুরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ উদ্ধার

১০

নগরীতে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ৩১

১১

জয়পুরহাটে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার ১

১২

মাহফিলের দাওয়াত ঘিরে দাওকান্দি কলেজে উত্তেজনা, প্রদর্শকের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ

১৩

বাড়ির সামনে ভূমিহীনদের অনশন ভাঙালেন ভূমিমন্ত্রী

১৪

রাজশাহীতে ইউনিয়নের কার্যালয় দখলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ

১৫

জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক তাজকিয়া আকবারী’র অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা

১৬

রাজশাহীতে রপ্তানি বাণিজ্য ও ডকুমেন্টেশন বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১৭

রাজশাহীতে বিপুল পরিমাণ নকল সিগারেট উদ্ধারসহ গ্রেপ্তার ১

১৮

মায়ের দুধের বিকল্প নেই, পুষ্টি সচেতনতা জোরদারের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

১৯

শিক্ষামন্ত্রীর সাথে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

২০

Design & Developed by: BD IT HOST