৩০ জুন ২০২৪
অনলাইন সংস্করণ

‘মৃত্যু হাতে নিয়ে পদ্মায় ডুব দেই’

স্টাফ রিপোর্টার: ‘বাঁচা-মরার চান্স থাকে ফিফটি ফিফটি। নদীতে ডুব দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পানির নিচে থাকি। পানির নিচে চারপাশে তিন থেকে চার স্কয়ার ফুটের বেশি দেখা যায় না। খুব অল্প দেখায় নদীর গভীরে ব্লক ও জঙ্গলের মধ্যে হাত দিয়ে মাছ ধরতে হয়। মৃত্যু হাতে নিয়ে মাছ ধরতে পদ্মায় ডুব দেই।’
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় পদ্মা নদীতে ডুব দিয়ে মাছ ধরতে আসা আব্দুস সোবহান। তিনি রাজশাহী নগরীর বালিয়াপুকুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে পদ্মা নদীতে ডুব দিয়ে মাছ ধরে আসছেন। সোবহানের সঙ্গে রয়েছেন আরও তিনজন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একটি মাছ ধরা নৌকায় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের চাকায় বাতাস দেওয়া গ্যাস সিলিন্ডার বসানো রয়েছে। তার পাশেই শ্যালো মেশিন চলছে। শ্যালো মেশিনের সাহায্যে কম্প্রেসারে শক্তি সঞ্চার করে তৈরি ‘অক্সিজেন’ পাইপের মাধ্যমে পানির ৪০ থেকে ৫০ ফুট নিচে পাঠানো হচ্ছে। আর সেখানে মাস্কের সাহায্যে অক্সিজেন নিয়ে মাছ ধরছেন আব্দুস সোবহান। ডুব দিয়ে বাঁধে ফেলা ব্লক ও পাথরের ফাঁকে থাকা চিংড়ি, ইঠা ছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।
আব্দুস সোবহান বলেন, ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে পদ্মা নদীতে এভাবে ডুব দিয়ে মাছ ধরি। শুধু মাছ ধরা নয়, অনেক সময় ডুব দিয়ে পাঙাশসহ বিভিন্ন মাছের ডিম ও পোনা আহরণের কাজ করতে হয়। পানির নিচে কোনো ঝুঁকি মনে হয় না। কোনোভাবে ওপর থেকে বাতাস সরবরাহ বন্ধ হলে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় পাইপে প্যাঁচ পড়ে বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। তখন মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, তিন বছর আগের কথা। রাজশাহী নগরীর ফুলতলায় মাছ ধরতে নেমেছি। সেখানে ৩০ থেকে ৩৫ ফুট পানির নিচে নেমেছিলাম। সেই হিসেবে যাওয়া-আশা মিলে প্রায় ৭০ ফুট। মাছ ধরে কোমড়ে বাঁধা বস্তায় রাখার একপর্যায়ে স্রোতের কারণে পাইপে প্যাঁচ পড়ে ওপর থেকে সরবরাহ করা অক্সিজেন বা বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় দ্রুত শরীরের ওজন বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা লোহার শিকল খুলে কোনো মতে উঠে পড়ি। সেই ধাক্কায় প্রাণে বেঁচে যায়। সেই কথা মনে পড়লে শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
মাছ ধরে প্রতিদিনের উপার্জনের বিষয়ে আব্দুস সোবহান বলেন, কোনো দিন মাছ পাই, আবার পাই না। আবার কোনো দিন সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার মাছ ধরি। এখানে যারা কাজ করে তাদের প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কোনো পারিশ্রমিক নেই। যে মাছ পাব সেইগুলো বিক্রি করে যে টাকা হবে তা খরচ বাদ দিয়ে সবাই ভাগ করে নিই।
জানা গেছে, এভাবে পবার শ্যামপুর, চারঘাটের ইউসুফপুরে পদ্মা নদীতে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে কম্প্রেসারে শক্তি সঞ্চার করে তৈরি ‘অক্সিজেন’ পাইপের মাধ্যমে পানির নিচে চলে গেছে। ঝুঁকি নিয়ে ডুব দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে মাছ ধরছেন জেলেরা। শ্যালো মেশিনের ইঞ্জিন চালিয়ে কম্প্রেসারে অক্সিজেন তৈরি করে পানিতে নামছেন তারা। এভাবে মাছ ধরতে গিয়ে গত বছর দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরও এমন ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরা বন্ধ হচ্ছে না।
নৌকায় কথা হয় শ্যামপুর নগরপাড়ার জেলে কাজল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওপরে বসে নৌকা নিয়ন্ত্রণ করছি। পাশেই অপরজন নদীর তলদেশে মাছ ধরা সোবহানের সংকেতের অপেক্ষা করছে। যখন সোবহান পানির গভীরে যাবে তাকে পাইপ সরবরাহ করছেন তিনি। তবে খেয়াল রাখতে হচ্ছে পাইপে যে কোনোভাবে প্যাঁচ না পড়ে। একবার ডুব দিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পানির নিচে মাছ ধরেন সোবহান।
তিনি আরও বলেন, নদীতে স্বাভাবিক নিয়মে কেউ জাল ফেলে আবার কেউ বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। এতে করে তেমন মাছ পাওয়া যায় না। এজন্য তারা বাধ্য হয়ে ডুব দিয়ে মাছ ধরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পন্থা বেছে নিয়েছেন। এভাবে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা। তবে পদ্মার পানি বাড়ছে। এখন জালে মাছ পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইউসুফপুরে বাঁধ এলাকায় ডুব দিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে ইউসুফপুর কারিগরপাড়া গ্রামের আবু বক্করের ছেলে জেলে আবু তালেব মিঠুর মৃত্যু হয়। ডুব দিয়ে মাছ ধরার সময় বাঁধের ব্লকে হাত আটকে তিনি আর উঠতে পারেননি। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল তার মরদেহ উদ্ধার করে। একই বছরের ১২ জুন ডুব দেওয়ার পর স্ট্রোক করে মারা যান খাইরুল ইসলাম। তিনি এলাকার মৃত খবির আলীর ছেলে।
চারঘাট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওয়ালি উল্লাহ মোল্লা বলেন, নদীতে মাছ কমে গেছে। তারা (জেলেরা) জীবিকার তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। গত বছর দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি।

আরও পড়ুনঃ   দেশে অবশ্যই যৌক্তিক সময়ে নির্বাচন হবে: সারজিস আলম

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পুঠিয়ায় সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি

বানেশ্বর শিক্ষকের মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে ক্লাস বর্জন, মহাসড়ক অবরোধ

দেশে ভালো নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করতে চাই : সিইসি

নগরীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ

হংকংয়ের সঙ্গে বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি, বাড়বে বিনিয়োগের সম্ভাবনা

নগরীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতে নারী মাদক ব্যবসায়ীর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

নগরীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার ৩ আসামি গ্রেপ্তার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

১২ সেপ্টেম্বর শুরু হচ্ছে তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান : মীর শাহে আলম

১০

গোদাগাড়ীতে অবৈধভাবে সার মজুত, সার জব্দসহ ডিলারের কারাদণ্ড

১১

নগরীতে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ১৭

১২

জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে শার্শায় প্রথম নিজামপুর ইউনিয়ন পরিষদ

১৩

নগরীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ৫ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

১৪

চারঘাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা

১৫

মোহনপুরে দেশীয় তৈরী ৪৫ লিটার চোলাই মদ উদ্ধার

১৬

রামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু

১৭

গোদাগাড়ীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় হেরোইন উদ্ধার

১৮

লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্রসমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর

১৯

পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

২০

Design & Developed by: BD IT HOST