স্টাফ রিপোর্টার : পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি জীবনের ভিত্তি, স্বাস্থ্য, জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম মূল উপাদান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো যেমন UDHR, ICESCR-এর General Comment No. ১৫ এবং SDG-৬-পানি-অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও জীবিকার অধিকারকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এই পুরো কাঠামোর আলোকে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট এখন একটি গভীর মানবাধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে।
বুধবার (১০ ডিস্মেবর) সকাল ১১ ঘটিকায় এসকে সেমিনার হলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক) ও গ্রিন কোয়াশিনের আয়োজনে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিবৈষিম্য ও মানবাধিকার:সকল, কাঠামো ও করনীয় বিষয়ক সংলাপ ও মতবিনিময় অনুষ্টিত হয়েছে।
সংলাপ ও মতিবিনিময়ের শুরুতেই ‘ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিবৈষম্য ও মানবাধিকার: সংকট, কাঠামো ও করনীয় বিষক বারসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তুলে ধরেন নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়ক মো. শহিদুল ইসলাম। পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনি বলেন- বাংলাদেশের সবচেয়ে শুষ্ক ও পানির অভাবে সংকট গ্রস্ত অঞ্চল হিসেবে বরেন্দ্র অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি আর শুধুই পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর মানবাধিকার ইস্যু। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোয় বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR) এর ২৫ অনুচ্ছেদে জীবন ধারণের উপযুক্ত মানের অধিকার এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তির General Comment No ১৫-এ স্পষ্টভাবে পানি অধিকারকে মানব মর্যাদা রক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঝউএ এর লক্ষ্যমাত্র সকলের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেয়।
সংবিধানও পানিকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার সাথে যুক্ত করেছে। অনুচ্ছেদ ১৫ মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের কথা বলে, অনুচ্ছেদ ৩১ জীবন ও দেহের নিরাপত্তার অধিকার দেয়, এবং অনুচ্ছেদ ১৮ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করে, যা নিরাপদ পানি ছাড়া কোনোভাবেই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বক্তারা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে যেভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রæত নিচে নেমে যাচ্ছে, গভীর নলকূপের মাধ্যমে কৃষি পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, খরা ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে, এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রতি লিটার পানির জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে, এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। পানি না থাকলে জীবনের অধিকারের বাস্তবায়ন অসম্ভব, খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ভেঙে পড়ে, এবং স্থানীয় অর্থনীতি টিকে থাকা কঠিন হয়।
সংলাপের মুক্ত আলোচনায় তানোর উপজেলার মন্ডুমালার মাহালী আদিবাসী কৃষানী চিচিলিয়া হেমব্রম বলেন- আমরা অনেক দুর থেকে পানি আনি, কোমরে ব্যাথা হয়, অনেক সময় পথে ঘাটে বিব্রতকর পরিস্থিতির মিকার হতে হয়। তিনি কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন- বাচ্চা যখন একগøাস পানির জন্য হাহাকার করে, চায়, দিতে পারি সঙ্গে সঙ্গে, বুকটাও ভেঙ্গে যায়।
সুজনের সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা ও পানি নীতিমালা আইনগুলো সবসময় উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়, এখানে বরেন্দ্র জনমানুষের কথা তাদের বাস্তবদিকগুলো প্রতিফলিত হয়না।
রুলফাও এর নির্বাহী পরিচালন- মো. আফজাল হোসেন বলেন- দিনে দিনে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো নষ্ট করা হয়েছে, বিলগুলো ধ্বংস করা হয়েছে পুকুর খনন করে। এর ফলে মানুষের অধিকার আরো সংকোচিত হয়েছে।
মহিলা পরিষদের নারী নেত্রী কল্পনা রায় বলেন- আমরা নারীরাই বেশি বৈষম্যের শিকার। বরেন্দ্র অঞ্চলে অনেক দুর থেকে নারীরা পানি সংগ্রহ করে , এর ফলে তার নিরাপত্তা সংকটে পড়ছে।
পরিবর্তনের রাশেদ রিপন বলেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি নিয়ে শুধু ব্যববসা হচ্ছে, পানি কিভাবে বিক্রি করা যায় সে বিষয়ে নীতিমালা আইন তৈরী হয়। জনগণের চাওয়া পাওয়ার দিক বিবেচনা করা হয়না। তিনি আরো বলেন- হঠাৎ করে গেজেট ঘোষণা করে বরেন্দ্র অঞ্চলে ৪ হাজার ৯১১ টি মৌজায় কৃষি কাজে সম্পূর্ণরুপে পানি ব্যবহার বন্ধ ঘোষনা করেছে সরকার। সরকার বিকল্প কিছু সৃষ্টি না করে এভাবে কৃষকের উৎপাদন থামাতে পারেনা। এসব অঞ্চলে স্বল্পপানির রবিশস্যের চাষাবাদ করা যেতো, সেটাও ঊহৃ করা হলো।
গ্রিন কোয়ালশনের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি আর কৃষি নিয়ে পরিকল্পনা করতে হলে একানকার প্রবীণ এবং অভিজ্ঞতা সাথে বসতে হবে, হুটহাট পরিকল্পনা করে তা চাপিয়ে দেয়া যাবেনা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অভিজিৎ তাঁর গবেষণা বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যগত গবেষণা তথ্য তুলে ধরে বলেন- পানির সাথে জীবন, সংস্কৃতি এমনকি রাজনীতিও জড়িত। তিনি আরো বলেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকেও দেখা যায় এখানে পানির নিয়ে রাজনীতির দিকটি জড়ি, এই পানি রাজনীতি এই জনপদের শস্য ফসল বৈচিত্র্যসহ পানি অধিকারের সবকিছুর সাথে জড়িত। তিনি মনে করেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিবৈষিম্য কমাতে এই অঞ্চলের মানুষের সাথে বসে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংলাপ ও মতবিনিময়ে উপস্থিত ছিলেন- পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রোকৌশলী মোসা: সামসুর নাহার, রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রোকৌশলী ফারুক আহমেদ, বরেন্দ্র উন্নয়ন কতৃপক্ষের নির্বাহী প্রোকৌশলী সৈয়দ জিল্লুর রহমান, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি শাইখ তাসনীম জামাল, ইয়্যাস এর সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক স¤্রাট রায়হান, ওয়াটার ইয়ুথ পার্লামেন্ট এর জুলফিকার আলী হায়দারসহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST