
স্টাফ রিপোর্টার : মানবপাচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের হাত থেকে দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘ট্রাপেড বিহাইন্ড দি স্ক্যাম: এনডিং হিউম্যান ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিনালিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, মানবপাচারের ধরন পরিবর্তনশীল এবং জটিল। তিনি বলেন, অপরাধী চক্রগুলো এখন কেবল প্রচলিত উপায়ে নয়, বরং ডিজিটাল মাধ্যম, ভুয়া অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণ সমাজ ও চাকরিপ্রার্থীদের ফাঁদে ফেলছে। আকর্ষণীয় কর্মসংস্থান ও উন্নত ভবিষ্যতের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তারা সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি হয়ে চরম নির্যাতন, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, মানবপাচার চক্র এখন বিভিন্ন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এ হুমকি মোকাবিলায় কেবল প্রথাগত আইনশৃঙ্খলা কেন্দ্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অর্থলগ্নি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও সচেতন সমাজকে সাথে নিয়ে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
মানবপাচার প্রতিরোধে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অপরাধ দমনে সরকার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জন করেছে। সরকার প্রণয়ন করেছে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন, ২০২৬’।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম কনভেনশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রটোকলসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত এ নতুন আইনে অনলাইন স্ক্যাম, প্রযুক্তিনির্ভর প্রলোভন ও জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করার মতো আধুনিক অপরাধগুলোকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। একই সাথে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে বেগবান করতে ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭’ যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সকল অংশীজনদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০)’ চূড়ান্ত করছে, যা প্রতিরোধ, সুরক্ষা, বিচার এবং অংশীদারিত্ব-এ চার প্রধান স্তম্ভকে আরো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
ভুক্তভোগীদের মর্যাদা ও পুর্নবাসন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবপাচারের শিকার প্রতিটি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। এজন্য ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম’ জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ভুক্তভোগীদের দ্রুত উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক আইনি, শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া যায়। তথ্যভিত্তিক নীতি নির্ধারণ এবং নিখুঁত কেস ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে একটি সর্বাধুনিক ‘ডিজিটাল পাচার প্রতিরোধ তথ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হচ্ছে। তরুণ সমাজ, নারী ও অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং ভুয়া নিয়োগ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য তিনি গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ জাতীয় সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. লিয়াকত আলী মোল্লা, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইওএম বাংলাদেশ-এর চিফ অব মিশন ও জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ড. লরা টম বোন্ডে।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ সোহরাব হোসেন ভূঁইয়া এনডিসি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এবছরের বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী দিবসের প্রতিপাদ্যের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন ইউএনওডিসি প্রোগ্রাম অফিস বাংলাদেশের প্রধান শাহ মোহাম্মদ নাহিয়ান। উদ্বোধনী সেশনের পর একটি তথ্যভিত্তিক ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান।
উদ্বোধনী সেশন শেষে আয়োজিত ওয়ার্কিং সেশনে ওয়ার্কিং সেশনে ‘ ট্রাপেড বিহাইন্ড দি স্ক্যাম : এড্রেসিং ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ডিসেপ্টিভ রিক্রুটমেন্ট এন্ড অনলাইন এক্সপ্লোয়েটেশন’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মুক্ত আলোচনা এবং ‘ ট্রাপেড ইন পারসুইট অব এ বেটার লাইফ’ শীর্ষক একটি সচেতনতামূলক পুতুলনাচ প্রদর্শিত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দফতর এবং জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের কাউন্টার ট্রাফিকিং টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
#
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST