২৪ মে ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহীতে ওজনে বিক্রি হচ্ছে গরু, হাট এড়িয়ে খামারে ঝুঁকছেন ক্রেতারা

প্রতিদিন বসতে শুরু করেছে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট। এখনো সেরকম জমে ওঠেনি ছবিটি রোববার দুপুরে রাজশাহী সিটি পশুর হাট থেকে তোলা।

স্টাফ রিপোর্টার : কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেও রাজশাহীতে এখনো জমে ওঠেনি পশুর হাট। বরং ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এবার ঝুঁকছেন খামারমুখী কেনাকাটায়। হাটের ভিড়, দালালের উৎপাত, অতিরিক্ত হাসিল আদায় ও নানা ধরনের হয়রানি এড়াতে অনেকেই সরাসরি খামারে গিয়ে গরু কিনছেন। সেখানে ওজন মেপে নির্ধারিত দামে গরু বিক্রি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে বাড়ছে আস্থা। ফলে রাজশাহীর বিভিন্ন খামারে এখন প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের ভিড়।

রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে খামারের সংখ্যা ২৬ হাজার ২৩৪টি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় খামার ইতোমধ্যে কোরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। খামারগুলোতে দেশাল, শাহীওয়াল, অ্যালবিনো, বাফেলো, নেপালি, ভুট্টি ও বিভিন্ন সংকর জাতের গরু পালন করা হচ্ছে। খামারভেদে এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা মূল্যের গরুও রয়েছে।

খামারগুলোতে গরু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। ক্রেতারা সরাসরি ওজন স্কেলে গরু মেপে পছন্দ অনুযায়ী পশু কিনে খামারেই রেখে যাচ্ছেন। অনেকেই ঈদের এক বা দুই দিন আগে গরু নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আবার অন্য জেলার পাইকাররাও সরাসরি খামার থেকে গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

খামারভিত্তিক এ বেচাকেনায় একদিকে যেমন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। কারণ এসব লেনদেনের বড় অংশই হাটের বাইরে সম্পন্ন হচ্ছে।

ক্রেতাদের মতে, ওজন অনুযায়ী গরু কেনাবেচায় প্রতারণার সুযোগ কম। গরুর প্রকৃত আকার, স্বাস্থ্য ও ওজন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। দরদাম নিয়েও বিভ্রান্তি কম থাকে। ফলে বাজেট অনুযায়ী সুস্থ ও উপযুক্ত পশু বেছে নেওয়া সহজ হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ   রাবির সাথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

রাজশাহীর পবা এলাকার একটি খামারে গরু দেখতে আসা চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হাটে গেলে ভিড়ের কারণে ভালোভাবে গরু দেখা যায় না। এখানে সময় নিয়ে দেখে, বুঝে কেনা যায়। যদিও খামারে দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে, তারপরও ঝামেলা এড়াতে খামারেই এসেছি।’

আরেক ক্রেতা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এবার সীমিত বাজেটের মধ্যেই কোরবানি দিতে হবে। বড় গরুর দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে। তাই ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে মাঝারি গরু খুঁজছি।’

খামারিরা বলছেন, এবার বড় গরুর তুলনায় মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই বেশি। ইতোমধ্যে অনেক খামারের প্রায় ৬০ শতাংশ পশু বিক্রি হয়ে গেছে। কেউ কেউ আগেভাগেই বুকিং দিয়ে রেখেছেন। ঈদের আগে নির্দিষ্ট সময়ে গরু পৌঁছে দিতে কিছু খামার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাও রেখেছে।

এসজে পদ্মা এগ্রোর মালিক মেহরাব হোসেন বলেন, ‘আগে আমরা ২০০ থেকে ৩০০ গরু প্রস্তুত করতাম। এবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সংখ্যা কমাতে হয়েছে। গোখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিক ও পরিচর্যা ব্যয় অনেক বেড়েছে। তারপরও বেশিরভাগ গরু আগেই বুকিং হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘ওজনে যে দাম দাঁড়ায় সেটাই রাখা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা বেশি।’

খামারিরা জানান, গত এক বছরে গোখাদ্য ও পশু পরিচর্যার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে অনেকে গরুর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি খামারিরা বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

অন্যদিকে রাজশাহীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট সিটিহাটে এখনো জমে ওঠেনি বেচাকেনা। প্রতি রোববার ও বুধবার বসা এই হাট ঘুরে দেখা গেছে- অন্যান্য বছরের তুলনায় গরুর আমদানি কম এবং বিক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দাম হাঁকছেন। স্থানীয় ক্রেতাদের উপস্থিতিও সীমিত।

আরও পড়ুনঃ   বাংলাদেশের প্রাণীকুলের রেডলিস্ট হালনাগাদকরণ বিষয়ক তিনদিনব্যাপি প্রশিক্ষন কর্মশালার উদ্বোধন

হাটে আসা পাইকারদের অভিযোগ, অতিরিক্ত হাসিল আদায়, দালালদের উৎপাত এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার অনেকেই আগ্রহ হারিয়েছেন।

ঢাকা থেকে আসা পাইকার ফয়েজ উদ্দিন ব্যাপারী বলেন, ‘আগে ঈদের দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা হাটে আসতেন। এবার সেই চিত্র নেই। পরিবহন খরচ বেড়েছে, সঙ্গে দালালদের ঝামেলাও আছে।’

আরেক পাইকার জুনায়েদ আহম্মেদ বলেন, ‘এখনো হাটে অতিরিক্ত হাসিল না নিলেও দালালদের উৎপাত অসহনীয়। আবার আগেভাগে ক্রেতা আসায় বিক্রেতারাও দাম কমাতে রাজি হচ্ছেন না।’

সরেজমিনে হাটে দেখা গেছে, গত বছর যে গরু ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার একই ধরনের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা।

সিটিহাটের ইজারাদার শওকত আলী অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘এখনো ক্রেতা ও গরু দুটোই কম। তবে ঈদের যত কাছে যাবে, হাটে বেচাকেনা তত বাড়বে। রোববারের পর থেকে প্রতিদিন হাট বসবে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, রাজশাহী বিভাগে এ বছর প্রস্তুত করা হয়েছে মোট ৪৩ লাখ কোরবানির পশু, যেখানে চাহিদা রয়েছে ২৪ লাখের মতো। ফলে এই অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ১৯ লাখ পশু দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হবে।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, এই বছরও রাজশাহী জেলায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৯১ হাজার ৯৫৩টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই উদ্বৃত্ত পশুগুলো দেশের বিভিন্ন হাটে চলে যাবে। আশা করা হচ্ছে খামারিরা তাদের ন্যায্য মূল্য পাবেন। হাটগুলোতেও খামারিদের পশু কেনাবেচায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

 

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বেকারত্ব দূরীকরণে উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করা হবে : রাসিক প্রশাসক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের বৈঠক

ভাঙ্গা টোলপ্লাজায় ১২০ বোতল ফেনসিডিল জব্দ, শিশুসহ আটক ৩

মানিকছড়িতে ভুয়া চিকিৎসক ও অনুমোদনহীন চক্ষু ক্যাম্প পরিচালনা: ৫ জনকে জরিমানা

রামেকে রোগী ধরার অভিযোগে দালাল চক্রের ৭ সদস্যের কারাদণ্ড

লক্ষ্মীপুরে ২২ ভরি স্বর্ণ নিয়ে উধাও, স্ত্রীসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

পবার বড়গাছীতে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় বীজ বপন ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত

অনলাইনে হুংকার দিয়ে জনগণকে ভয় দেখানো যাবে না : তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী

সামগ্রিক উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে : শিক্ষামন্ত্রী

রাজশাহী মহানগরীর শান্তি বিনষ্টের যেকোন অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে: মাহফুজুর রহমান রিটন

১০

ঢাকার যানজট, ডেঙ্গু ও জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ এলজিআরডি মন্ত্রীর

১১

গোদাগাড়ীতে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

১২

রাসিককে পৌরকরের চেক হস্তান্তর করেছে রাকাব

১৩

রাকাবে চালু হলো স্মার্ট ডিজিটাল ইকোসিস্টেম এনপিএসবি ও বাংলা কিউআর

১৪

চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে : পানিসম্পদ মন্ত্রী

১৫

নগরীরতে পরিত্যক্ত অবস্থায় ককটেল ও পেট্রোল বোমা উদ্ধার

১৬

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের পিতার মৃত্যুতে শোক

১৭

জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

১৮

প্রিপেইড মিটার বাতিলসহ ৬ দফা দাবিতে রংপুরে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ

১৯

রাজশাহীতে সার সংকট ঠেকাতে ‘পবা সার ডটকম’ সেবা চালু

২০

Design & Developed by: BD IT HOST