অনলাইন ডেস্ক : ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সৌদি আরবের লোহিত সাগরগামী অন্যতম প্রধান একটি তেল পাইপলাইন আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পুনরায় চালু করা সম্ভব না হলে দেশটির রপ্তানিযোগ্য তেলের মজুত সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাবে। এতে বিশ্ব বাজারে দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঘাটতি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক তেল ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।
রোববার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব থেকে জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে গেলে তা বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। ইতোমধ্যে এই সংকটে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়েছে এবং মার্কিন বন্ডের সুদের হার ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
শুক্রবার ড্রোন হামলার পর বাধ্য হয়ে নিজেদের অন্যতম প্রধান পূর্ব-পশ্চিমের তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে হুথিদের হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিংবা এই গুরুত্বপূর্ণ পথ কত দিন বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে রিয়াদ এখনও কোনো স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়েছে। একটি সূত্র বলেছে, পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে আরেকটি সূত্র বলেছে, মেরামত কাজ অপেক্ষাকৃত দ্রুত শেষ হতে পারে এবং কাজ চলাকালীন আংশিক তেল পাম্পিং পুনরায় চালু করা সম্ভব।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সৌদি আরবের সরকারি তথ্য দপ্তর ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
আরব উপদ্বীপের মরুভূমির বুক চিরে যাওয়া এই পাইপলাইন গত ছয় মাস ধরে সৌদি আরবকে বেশ সুরক্ষা দিয়ে আসছে। হরমুজ প্রণালি যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় প্রতিবেশীদের রপ্তানি স্থবির হয়ে গেলেও সৌদি আরব এই বিকল্প পথ ব্যবহার করে রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পেরেছিল।
বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক এই দেশটি পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে ঘুরিয়ে নিতো, যা বিশ্বজুড়ে মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। তবে বর্তমানে এই পথ বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরে যে পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের রপ্তানি সচল রাখা সম্ভব বলে সৌদি রপ্তানি সংক্রান্ত বিষয়ে অবহিত তিনটি শিল্প সূত্র জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র বলেছে, এ ছাড়া লোহিত সাগরের মিসরের আইন সুখনা এবং ভূমধ্যসাগরীয় সিদি কেরিও বন্দরের মাধ্যমে গ্রাহকদের আরও কয়েক দিন তেল সরবরাহ করার মতো সীমিত মজুত সৌদি আরবের রয়েছে।
শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ানবু বন্দরের তেল মজুত রাখার ক্ষমতা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল। অন্যদিকে আইন সুখনা এবং সিদি কেরিরের ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ ও ২ কোটি ব্যারেল। তবে সূত্রগুলো বলছে, এসব কেন্দ্রে মজুত পুরোপুরি পূর্ণ নেই এবং ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন পুনরায় চালু না হলে একপর্যায়ে এই মজুতও শেষ হয়ে যাবে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)বেলেছে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় গত আগস্টে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ দিনে ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ হ্রাস পাবে।
পাইপলাইনে হামলার পাশাপাশি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা শুক্রবার লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে একটি দ্বীপ দখলে নিয়েছে। চলমান যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হতো। তবে একাধিক শিল্প সূত্র বলেছে, বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ কমে দিনে মাত্র ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
সৌদি আরব গত সপ্তাহে ওপেককে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল; গত আগস্টে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৬২ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST