
স্টাফ রিপোর্টার : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া গুজব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর কনটেন্ট এবং ‘সিনথেটিক সাংবাদিকতা’র এই সময়ে সত্য যাচাইয়ের দক্ষতা অর্জন ছাড়া সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ।
তিনি বলেন, মিথ্যার বাজার সবসময়ই বড়। সত্য যখন জুতার ফিতা বাঁধছে, ততক্ষণে মিথ্যা পৃথিবী একবার ঘুরে আসে। তাই মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাংবাদিকদের ফ্যাক্ট-চেকিং জানতে হবে। ছবি, তথ্য ও ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
শুক্রবার রাজশাহীতে সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত ‘এআই ও ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১৫ থেকে ১৭ জুলাই তিন দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তাঁর ভাষায়, ফ্যাসিবাদের আমলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক ধরনের অপমৃত্যু ঘটেছে। সাংবাদিকতা পরিণত হয়েছিল শিকারী সাংবাদিকতায়। এখন আবার ‘সিনথেটিক সাংবাদিকতা’র যুগ শুরু হয়েছে, যেখানে যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় প্রত্যেক মানুষের হাতেই একটি করে গণমাধ্যম রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তথ্য ছড়ানো যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি গুজব ও অপপ্রচারও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, আগে আপনার হাত-পায়ে শিকল ছিল, এখন আপনি এত স্বাধীন যে বুঝতেই পারছেন না কখন মিথ্যার দিকে ছুটে যাচ্ছেন। তাই সাংবাদিকদের দায়িত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
সাংবাদিকদের শুধু সংবাদ সংগ্রহকারী নয়, সমাজ গবেষক হিসেবেও নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে পিআইবির মহাপরিচালক বলেন, একজন সাংবাদিক শুধু খবর সংগ্রাহক নন, তিনি সমাজ পর্যবেক্ষক, গবেষক ও লেখক। তাঁর রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের ইতিহাস রচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, সংবাদকে কেবল ঘটনাকেন্দ্রিক রাখলে হবে না। পরিবর্তিত সমাজ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা নিরাপত্তার মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে আনতে হবে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রতিবেদনে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ভালো সাংবাদিকতার মূল শক্তি হচ্ছে সম্পর্ক। গবেষক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হবে। এতে রিপোর্ট সমৃদ্ধ হবে এবং বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে।
তরুণ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাকে পড়তে হবে, সরল বাংলা লিখতে হবে। ছোট ও সহজ বাক্যই সবচেয়ে শক্তিশালী। একটি পরিসংখ্যানও গল্পের আকারে উপস্থাপন করা গেলে সেটি পাঠকের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেখানে পরিচিতি গড়ে তুলতে হবে একজন দায়িত্বশীল ফ্যাক্ট-চেকার হিসেবে, গুজব ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে নয়।
পিআইবির কার্যক্রম তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে একাডেমিক উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাস্টার্স, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনার পাশাপাশি সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রকাশনা চালু রয়েছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের রাষ্ট্র খুব বেশি কিছু দেয় না। অন্তত দক্ষতা বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারলে সেটাই বড় সহায়তা হবে।
প্রেস ক্লাবগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান নয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজনেও এগিয়ে আসা উচিত। অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা নতুন প্রজন্মকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিলে পুরো সাংবাদিক সমাজই উপকৃত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে সনদপত্র বিতরণ করা হয়। তিন দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণে রাজশাহীর বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা এআইভিত্তিক টুলের ব্যবহার, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল অনুসন্ধান এবং ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণের বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST