
স্টাফ রিপোর্টার : গ্রাম আদালত কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে উচ্চ আদালতের ওপর থেকে মামলার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বিচারপ্রার্থীরা স্বল্প সময় ও স্বল্প খরচে ন্যায়বিচার পেতে পারবেন। প্রচলিত আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, সেখানে গ্রাম আদালতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যেই বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। ফলে গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দীর্ঘসূত্রতা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সকালে জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত গ্রাম আদালত সক্রিয়করণের আইন সহায়তা প্রদানকারী এনজিওসমূহের ভূমিকা ও করণীয় শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। সভার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প।
স্থানীয় সরকার শাখা রাজশাহীর উপপরিচালক মো. জাকিউল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার।
সভায় জানানো হয়, গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলার ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ৬ হাজার ১৬৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯৬৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তিকৃত মামলার মধ্যে নারী সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ১ হাজার ৬৫১টি।
প্রকল্পের আওতায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করা হয়েছে ৭ কোটি ৬৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৩ টাকা। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫৭ শতক জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি ২ লাখ টাকা। গ্রাম আদালতে অনধিক তিন লাখ টাকা মূল্যমানের দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে মো. জাকিউল ইসলাম বলেন, গ্রাম আদালতের কার্যকারিতা বাড়াতে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের দক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এতে মামলা ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।
তিনি বলেন, গ্রাম আদালত একটি সময়োপযোগী ও জনগণকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা। এটি শক্তিশালী করা গেলে গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজেই ন্যায়বিচারের আওতায় আসবে। প্রশাসনের পাশাপাশি আইন সহায়তা প্রদানকারী এনজিও এবং গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
গ্রাম আদালত প্রকল্পের জেলা ব্যবস্থাপক মো. লুৎফর রহমান বলেন, গ্রাম আদালতের সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা অপরিহার্য। গণমাধ্যমে নিয়মিত ইতিবাচক ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ হলে মানুষের আস্থা বাড়বে এবং গ্রাম আদালতের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাম আদালতের আইনি দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রকল্পের লিগ্যাল অ্যানালিস্ট মশিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত গঠন করা হয়েছে। এই আদালত ইউপি চেয়ারম্যানসহ পাঁচ সদস্যের একটি প্যানেল দ্বারা পরিচালিত হয়। মামলার শুনানি শুরু হওয়ার পর অনধিক ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হয় এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে রায় প্রদান বাধ্যতামূলক।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) হেলেনা আকতার, ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মারুফ আহমেদ, আশ্রয়ের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক রেজুয়ান মন্ডলসহ গ্রাম আদালত সক্রিয়করণে যুক্ত বিভিন্ন আইন সহায়তা প্রদানকারী এনজিওর প্রতিনিধিরা।
বক্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে এনজিওগুলো জনগণকে আইন সম্পর্কে সচেতন করা, মামলা দাখিলে সহায়তা প্রদান এবং নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে গ্রাম আদালত ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে গ্রাম আদালত গ্রামীণ ন্যায়বিচারের অন্যতম কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST