
মমিনুল ইসলাম মুন, স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নামলেও কমছে না পানির ব্যবহার। বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে অবাধ ও অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন। খরাপ্রবণ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ইতোমধ্যে পানিসংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
সরকারি তথ্যমতে, রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার মোট ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে আগামী ১০ বছরের জন্য এসব মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি গেজেটের কপি হাতে পেয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
গেজেট অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে এসব ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা অবস্থিত। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল প্রায় ২৬ ফুট নিচে। ক্রমাগত ও অপরিকল্পিত উত্তোলনের ফলে ২০১০ সালে তা নেমে আসে ৫০ ফুটে। ২০২১ সালে পানির স্তর আরও নিচে নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৬০ ফুটে। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১১৩ ফুটেরও নিচে নেমে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখতে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং গভীর নলকূপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, অগভীর বা সেমিডিপ নলকূপে উত্তোলিত পানির মাত্র ৩০ শতাংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়, বাকি ৭০ শতাংশ অপচয় হয়। বিপরীতে গভীর নলকূপে উত্তোলিত পানির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য থাকে।
এদিকে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজশাহী অঞ্চলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ ব্যক্তি মালিকানায় গভীর ও অগভীর নলকূপ বসিয়ে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিকাজের জন্য হাজার হাজার নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষই রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছে।
পানি সংকটের তীব্রতায় তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকায় একের পর এক বোরহোল খনন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ১৬০ থেকে ২০০ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়েও পানির সন্ধান মিলছে না। এসব ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত খোলা রেখেই নতুন করে আবার খনন করা হচ্ছে। সম্প্রতি তানোরে এমন একটি পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে দুই বছরের শিশু সাজিদ হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর মাটির ৫০ ফুট নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এই দুর্ঘটনার পর রাজশাহী বিভাগে স্থাপন করা গভীর নলকূপের তথ্য তলব করেছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার উন্নয়ন করপোরেশনের সেচ বিভাগকে চিঠি দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পরিত্যক্ত পাইপের মুখ সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের তত্ত্বাবধানে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে রাজশাহী অঞ্চলে পানি সংকটাপন্ন এলাকার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ মিটারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার একটি স্থানে সর্বোচ্চ ৪৬ দশমিক ৮৭ মিটার গভীরতায় পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে।
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের মোট ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৮৭টি ইউনিয়নকে অতি উচ্চ ও উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পোরশা উপজেলার ছয়টি এবং নাচোল উপজেলার চারটি ইউনিয়নের সবকটিই অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকার অন্তর্ভুক্ত।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অব্যাহতভাবে নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ব্যক্তি মালিকানায় সেমিডিপ নলকূপ স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। শুধু গত বছর তানোর উপজেলাতেই উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদনে ৩২টি সেমিডিপ নলকূপ বসানো হয়েছে।
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান জানান, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য খোঁড়া পরিত্যক্ত গর্তগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে অপরিকল্পিতভাবে কাউকে গভীর বা সেমিডিপ নলকূপ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরি সারওয়ার জাহান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির সম্মিলিত ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST