২৯ অক্টোবর ২০২৫
অনলাইন সংস্করণ

দশ বছরে ৮ বার আগুন, বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্যাগার অগ্নিঝুঁকিতে

মনির হোসেন, বেনাপোল : গত ১০ বছরে যশোরের বেনাপোল স্থল বন্দরের গুদামে আটবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা আজ পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ পাননি। ঢাকার বিমান বন্দর কার্গো ভিলেজে আগুন লাগার পর বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বলছেন, পরিকল্পিত নাশকতা যাতে না ঘটে সেজন্য বন্দর ও পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন, ঢাকায় আগুন লাগার পর তারা আরও বেশি সতর্ক হয়েছেন। কড়া নজরদারি করার পাশাপাশি নেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিসের একটি টিপ ঘটণাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে এসেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো বেনাপোল বন্দরে অগ্নি নিরাপত্তা যথেষ্ট নেই।

দেশের বৃহত্তর স্থলবন্দর বেনাপোলের অধিকাংশ গুদাম এবং ওপেন ইয়ার্ডে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অর্পযাপ্ত। যে কারণে পণ্যাগার অগ্নিকান্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্দরে জায়গা সংকটের কারণে আমদানি করা অতি দাহ্য পণ্যের পাশাপাশি সাধারণ পণ্য রাখা হচ্ছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৬ আগস্ট বন্দরের ৩৫ নম্বর শেডে আগুনে কোটি টাকার আমদানি করা পণ্য পুড়ে যায়। এ জন্য অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, গত ১০ বছরে বন্দরের গুদামে আটবার আগুন লেগেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় প্রতিবারই আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দমকল বাহিনী ডেকে আগুন নেভাতে হয়। এর আগেই পুড়ে যাচ্ছে আমদানি করা কোটি কোটি টাকার পণ্য। আগুনে পণ্য পুড়লেও ক্ষতিপূরণ পাননি আমদানিকারকরা।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল বন্দরে ৩৮টি গুদাম ও ওপেন ইয়ার্ড রয়েছে। এখানে ধারণক্ষমতা ৪৭ হাজার ৪৪০ টন পণ্য। কিন্তু রাখা হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য। গাদাগাদি করে পণ্য রাখার কারণে অগ্নিঝুঁকি আরো প্রকট হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   নওগাঁ-১ আসনে ভোটের লড়াইয়ে ৫ প্রার্থী

সম্প্রতি বন্দরের বিভিন্ন গুদামে গিয়ে দেখা গেছে, অতি দাহ্য ও সাধারণ পণ্য কাছাকাছি রাখা রয়েছে। ড্রামভর্তি ডাইস (রঙ), বস্তা ভরা রেইজিং পাউডার, ছাপাখানার কালিসহ অন্যান্য পণ্য রাখা আছে। গুদামের সাথে রয়েছে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র (এক্সটিংগুইসার)।

পাশের ৩৪ নম্বর গুদামে গিয়ে দেখা যায়, মটরগাড়ির ইঞ্জিন তেলসহ (লুব্রিকেন্ট) বিভিন্ন ধরনের পণ্য রয়েছে। এখানেও পণ্য রাখার কোনো শৃঙ্খলা নেই। ওইগুলো দেখলেই বোঝা যায়, বহুকাল যন্ত্রগুলোতে হাত দেয়া হয়নি। ২৯ নম্বর গুদাম ও খালি ট্রাক টার্মিনালে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। আগুন নেভানো নিজস্ব ভালো কোনো ব্যবস্থাপনা নেই।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর বন্দরের ২৩ নম্বর গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে গুদামে রাখা তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের আমদানি করা কাপড়, ডাইস (রঙ), বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, শিল্পের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, মটরগাড়ির যন্ত্রাংশ, ফাইবার, মশা তাড়ানো স্প্রে, তুলা, কাগজসহ কোটি কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের পণ্য পুড়ে যায়। তখন তদন্ত কমিটি করা হলেও তিন বছরেও ব্যবসায়ীরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।

এ ব্যাপারে আমদানি-রফতানিকারক সমিতি বেনাপোলের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, গত ১০ বছরে বন্দরে অন্তত আটবার আগুন লেগেছে। এতে শত শত কোটি টাকার পণ্য পুড়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। প্রায় বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য চুরি হচ্ছে। ‘বন্দরের প্রতিটা গুদাম ও ওপেন ইয়ার্ড অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। এজন্য নজরদারি বাড়ানোর সাথে অগ্নি নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। কেননা দেশ বিরোধীরা নাশকতা ঘাটাবেনা এমন আশংকা উড়িয়ে দেয় যাবেন।

বেনাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়াডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘বন্দরে পণ্য রাখার জায়গা বাড়াতে হবে। অতি দাহ্য পণ্যে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। আগুন নেভানোর জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে কেবল এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।’ এই বন্দরটি অগ্নিঝুঁকিতে থাকছে সব সময়।

আরও পড়ুনঃ   বড়াইগ্রামে খ্রিস্টান ধর্মপল্লীগুলোতে 'অল সোলস ডে' পালিত

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও আমদানিকারক মিজানুর রহমান খান জানান, এর আগে কয়েকবার আগুন ধরে ব্যবসায়ীরা সর্বস্বান্ত হয়েছে। আমরা বারবার বলার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ব্যবসায়ীরা সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে, বন্দরের ভাড়া প্রদান করছে অথচ তাদের আমদানি করা পণ্যের নিরাপত্তা দিচ্ছে না। রহস্যজনক কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ এসব পণ্যের বিমাও করেন না। বেনাপোল বন্দর অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এজন্য কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে। পুরো বন্দর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে।

বেনাপোল ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ বায়োজিদ বোস্তামি জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর আমরা বেনাপোল বন্দরের গুদামগুলো পরিদর্শন করেছি। ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৮ নম্বর শেডে কেমিক্যাল রাখা হয়। সেখানে ওই সময় ২৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৫১ কেজি কেমিকেল পণ্য ছিল। চাহিদা অনুযায়ী সব সময় একই ওজনের কেমিক্যাল পণ্য আমদানি হয়ে থাকে।

বন্দরের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল। আমরা দাহ্য পদার্থ কিভাবে রাখতে হয় তার সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছি।

এ ব্যাপারে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন রেজা বলেন, অগ্নিঝুঁকি নেই এই কথা বলবো না। তবে কেউ যদি নাশকতা করার চেষ্টা না করতে পারে সেজন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বন্দর সচল রাখার সাথে আগুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে হাই এলাট জারি করেছি। প্রতিটি গুদামে ফায়ার হাইডেন পয়েন্ট ও ফায়ার পাম্প রয়েছে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রুয়েটের সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত

জেলা পরিষদ প্রশাসককে কমেলা হক ডিগ্রি কলেজের ফুলেল শুভেচ্ছা

রাজশাহী কোর্ট একাডেমিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন রাসিক প্রশাসক

নগরীতে পৈতৃক সম্পত্তির বিরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, হাসপাতালে আহত বয়েজ উদ্দিন

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের দাবি : ধূমপায়ীদের চাকুরিতে অযোগ্য বিবেচনার

সিলেট পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

মৌলভীবাজারের পথে প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক মেসির, আর্জেন্টিনার উড়ন্ত সূচনা

আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচে জিতবে কে? কী বলছে সুপার কম্পিউটার?

মন চাইলেই বৈশ্বিক জ্বালানি পথ বন্ধ করতে পারে ইরান

১০

সুইস বিলাসবহুল বুর্গেনস্টক রিসোর্টে সই হচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি

১১

রাজশাহীর কালাই রুটি খেয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রশংসা

১২

পুঠিয়ায় দুই মাদকসেবীর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট

১৩

আরইউজের সভায় বক্তারা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

১৪

রাজশাহীতে ‘জেএফএ অনুর্ধ্ব-১৪ ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্বোধন

১৫

পুঠিয়া রাজবাড়ীর ঐতিহ্যে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত

১৬

রাসিক প্রশাসকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ

১৭

লালপুরে পদ্মা নদীতে নৌকা থেকে গুলিবিদ্ধ এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার

১৮

বাঘা উপজেলা প্রশাসনের সাথে জেলা প্রশাসকের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

১৯

রাজশাহীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ৩ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

২০

Design & Developed by: BD IT HOST