স্টাফ রিপোর্টার : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনের সবগুলোতেই মূল লড়াই হতে যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে। অবশ্য দুটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। তবে এনসিপি কিংবা ছোট অন্য কোনো দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী আলোচনায় তেমন জায়গা করে নিতে পারেননি। অনেক ছোট দলের প্রার্থী নিজেদের সাংগঠনিক ও আর্থিক দুর্বলতার কারণে সব কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টও দিতে পারেননি বলে জানা গেছে।
রাজশাহী বিভাগের আট জেলায়৩৯ আসনে ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৫ হাজার ২৮৭টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৬৭টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিভাগে মোট প্রার্থী রয়েছেন ২১২ জন। এর মধ্যে নাটোর-১ আসনের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইয়াশির আরশাদ রাজন, বগুড়া-৫ আসনের এলডিপির প্রার্থী খান কুদরত-ই-খুদা সাকলায়েন এবং বগুড়া-২ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
ভোটের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরাই এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করছেন। রাজশাহী-২, রাজশাহী-৩, রাজশাহী-৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, নাটোর-১, নওগাঁ-১, নওগাঁ-৩, নওগাঁ-৫, বগুড়া-৫, বগুড়া-৬, জয়পুরহাট-২, সিরাজগঞ্জ-১, সিরাজগঞ্জ-২, সিরাজগঞ্জ-৩, সিরাজগঞ্জ-৬ ও পাবনা-২ আসনে বিএনপি প্রার্থীরা তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে রাজশাহী-৪, নাটোর-৪, নওগাঁ-২, নওগাঁ-৪, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, জয়পুরহাট-১, সিরাজগঞ্জ-৪, সিরাজগঞ্জ-৫ ও পাবনা-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে নাটোর-৩ আসনে দাউদার মাহমুদ এবং নওগাঁ-৬ আসনে আলমগীর কবির এলাকায় ভাল ফল করতে পারেন বলে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এদিকে রাজশাহী-১, রাজশাহী-৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, নাটোর-২, বগুড়া-১, বগুড়া-৩, বগুড়া-৭, পাবনা-১, পাবনা-৩ ও পাবনা-৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হারুনুর রশীদ এবং নাটোর-২ আসনে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জামায়াত প্রার্থীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নির্বাচনে ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে মাঠে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন না। উত্তরের জেলাগুলোতে গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও নাগরিক ঐক্যের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে অনেকেই হাতেগোনা কয়েকটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দিতে পেরেছেন।
রাজশাহী-১ আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মির মো. শাহজাহান জানান, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, সুষ্ঠু ভোট হলে পোলিং এজেন্টের প্রয়োজন পড়ে না।
রাজশাহী-২ আসনের লেবার পার্টির প্রার্থী মেজবাউল ইসলাম বলেন, সব কেন্দ্রে এজেন্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি।
রাজশাহী-৩ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী আফজাল হোসেন প্রায় ৪০টি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
একই আসনে আমজনতার দলের প্রার্থী সাঈদ পারভেজ কোনো কেন্দ্রেই এজেন্ট দিতে পারেননি।
রাজশাহী-৪ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী তাজুল ইসলাম খান জানান, তিনি পাঁচটি কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পেরেছেন, তবে আর্থিক সংকটে বাকিগুলোতে পারেননি। একই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফজলুল হকও কোনো কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
প্রচারণা পর্বে রাজশাহী বিভাগের সামগ্রিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে পেট্রল বোমা, ককটেল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত এসব বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। অনেকের আশঙ্কা, ভোটের দিন সহিংসতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এসব মজুত করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার দিবাগত রাতে রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার ছোটবনগ্রাম এলাকা থেকে ১২টি পেট্রল বোমা ও ১৫টি ককটেল উদ্ধার করে র্যাব। বুধবার নওগাঁর বদলগাছী থানাধীন ঝারঘড়িয়া গ্রাম থেকে চারটি পেট্রল বোমা ও বোমা তৈরির ৪০০ গ্রাম কেমিক্যাল উদ্ধার করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার রাজশাহী উত্তর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪০টি ককটেল ও ৪০টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গত রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের পাড়ঘোড়াপাখিয়া এলাকা থেকে ৬ কেজি ২৭০ গ্রাম গানপাউডার উদ্ধার করা হয়। একই দিনে রাজশাহীর বাগমারা এলাকা থেকেও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর শাহমখদুম থানা এলাকা থেকে একটি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান, দুটি এয়ারগান ও ২০ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করে র্যাব।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনে সহিংসতার উদ্দেশ্যেই এগুলো মজুত করা হয়েছিল।
ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভাগের ৫ হাজার ২৬৬টি কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। অপরাধী শনাক্তে ২ হাজার ৩১৮টি কেন্দ্রে পুলিশ বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে।
বুধবার বিভাগীয় কমিশনার আ.ন.ম. বজলীর রশীদ তাঁর কার্যালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে জানান, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেনাবাহিনী এই বিভাগে ৫৬টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। একই সময়ে পুলিশ ৭৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৪৩৩টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এ সময় বৈধ অস্ত্র জমা পড়েছে ৪ হাজার ৫৯৪টি।
তিনি জানান, রাজশাহী বিভাগে ২১৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৩৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৬৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১০ হাজার, বিজিবির ৪ হাজার ১২৩ জন, রেঞ্জ পুলিশের ১৩ হাজার ৭৯৬ জন, রাজশাহী নগর পুলিশের ২ হাজার ৪০৫ জন, র্যাবের এক হাজার ছয়জন এবং আনসার সদস্য রয়েছেন ৭২ হাজার ৭৩৬ জন।
বিভাগীয় কমিশনার বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। কোনো প্রার্থী বা সমর্থক আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্তের যে কোনো চেষ্টা প্রতিহত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST