মমিনুল ইসলাম মুন, স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর তানোরে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করা হচ্ছে। উপজেলা সরকারি হাসপাতাল সংলগ্ন, গোল্লাপাড়া বাজার, মুন্ডুমালা ও চৌবাড়িয়া বাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে চটকদার নামের ভুঁইফোড় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নীতিমালা লঙ্ঘন করে গড়ে উঠা একশ্রেণির হাসপাতাল ও ক্লিনিকেে মাঝে মধ্যেই ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভুল রিপোর্ট দেয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। সম্প্রতি তানোর সদরের মহানগর ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসা খেসারত দিচ্ছেন রোজিনা খাতুন নামের একজন মহিলা জিনাকে ভুল করে অপারেশন করেছিলেন। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই ক্লিনিকে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় ও কাগজপত্র ঠিক না করা পর্যন্ত ক্লিনিক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখন পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা রেখে সকল কার্যক্রম চালু রেখেছেন। আবার গত কয়েকদিন আগে মুন্ডুমালা পৌর সদরের পদ্মা ক্লিনিক এন্ড ডায়গনিক সেন্টারে ভুল অপারেশনে একটি নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে টাকা পয়সার বিনিময়ে সমঝোতা করে নেন। কিন্তু প্রশাসন নিরব ভূমিকায় রয়েছে এখন পর্যন্ত ওইসব ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। নীতিমালা লঙ্ঘন করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই নিজস্ব কোনো চিকিৎসক। অথচ প্রতিটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে একাধিক চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দক্ষ টেকনিশিয়ানদের স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে প্যাথলজির বিভিন্ন পরীক্ষার প্রতিবেদন দেন সেখানকার কর্মচারীরা। এমনকি মালিক ও কর্মচারীরা চিকিৎসক সেজে চিকিৎসা দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ,উপজেলায় নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১০ শয্যার একটি বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের জন্য সার্বক্ষণিক একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও একজন প্রশিক্ষিত সেবিকা থাকার বিধান রয়েছে। আর ডায়াবেটিস বিভাগের জন্য স্ব-স্ব সেক্টরে সরকার অনুমোদিত ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এসব নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কা না করে উপজেলা জুড়ে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ গড়ে তোলা হয়েছে।
স্থানীয় সুত্র জানায়, তানোর পৌর সদরের গোল্লাপাড়া বাজারে ‘তানোর জেনারেল হাসপাতাল’ নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। তবে, এই হাসপাতালের সাইনবোর্ডের নিচে সরকার অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল বলা হলেও নিবন্ধন নম্বর দেয়া হয়নি। এছাড়াও নিউ মডার্ন ক্লিনিক নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। প্রাইম ক্লিনিক বন্ধ রাখা নির্দেশ দেওয়ার পর খোলা রাখা হচ্ছে অপরদিকে, উপজেলার সরনজাই বাজারে গড়ে তোলা হয় গ্রীন কেয়ার নামে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সেখানে উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালতে রাব্বিল ইসলাম নামের একজনকে ৬ মাসের জেল ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্ত্ত জামিনে বেরিয়ে রাব্বিল ইসলাম একই প্রতারণা শুরু করেছেন। এছাড়াও মুন্ডুমালা পৌর সদরে রয়েছে পদ্মা এবং আসনারা নামে ক্লিনিক এ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার । সেখানেও নেই কোন দক্ষ টেকনিশিয়ান। এসব ক্লিনিক, ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে ডিএমএফ ডাক্তার দ্বারা প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্বাস্থ্য বিভাগের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের মাসিক মাসোহারা দিয়ে অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো চলছে। যে কারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নেই কোনো নজরদারি। তারা সব সময় প্রভাবিত হন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিক ও ম্যানেজার দ্বারা। ফলে ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকেরা স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি কোনো নিয়মনীতি মানছেন না। অনিয়ম ও অপচিকিৎসার কারণে মাঝেমধ্যে ঘটছে রোগী মৃত্যুর ঘটনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাৎক্ষণিক সেবা নিতে এসে রোগীরা বেশির ভাগ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। তারা ভালো মানের চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা দেয়ার কথা বলে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীরা ডাক্তার সেজে রোগীদের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দেন। এমনকি রোগীদের সিজারিয়ানসহ নানা ধরনের অপারেশন করছেন। আর প্রশিক্ষিত সেবিকার কাজ করানো হয় আয়া ও পিয়ন দিয়ে। ভুক্তভোগীরা বলেন, দি পদ্মা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা -নিরীক্ষার নামে প্রতারণা করা হচ্ছে কর্মচারী দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে এতে অন্য কোনো প্যাথলজিস্টদের স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে প্রতিবেদন দেন। এ বিষয়ে উপজেলা উপজেলা হাসপাতাল ও জেলা সিভিল সার্জন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো সুফল আসছে না।
উপজেলা হাসপাতালের নাম প্রকাশে এক চিকিৎসক বলেন, তানোরের অধিকাংশ ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিজস্ব চিকিৎসক নেই। দু’একটা ক্লিনিকে ভাড়া করা চিকিৎসক দিয়ে শুধু অস্ত্রোপচার করিয়ে নেন। বাকি কাজ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা করেন। অথচ ক্লিনিকের সামনে একাধিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নাম ব্যবহার করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা আছে। যার বেশির ভাগ ভুয়া চিকিৎসক। অথবা যার নাম ব্যবহার করে প্রচারণা করছে, হয়তো ওই চিকিৎসকেরা জানেন না। আবার অনেক ক্লিনিক মালিক নিজেরাই চিকিৎসক সেজে অস্ত্রোপচার করছেন। এতে রোগীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। এর ফলে মাঝেমধ্যে রোগী সঠিক সময়ে যথাযথ চিকিৎসাসেবার অভাবে মারাও যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সুত্র জানায়, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেন কোনো হয়রানি বা আইনি জটিলতা না হয় এজন্য সব মালিক মিলে প্রশাসন ম্যানেজ করা হয়। যেকোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধান করা যায়।
এবিষয়ে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. বার্নাবাস হাসদাক বলেন, কোনো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপচিকিৎসার অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এবিষয়ে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন বলেন, তানোরে অনেক ক্লিনিক ও প্যাথলজি সেন্টারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে একটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাকিগুলোতে দ্রুত অভিযান চালানো হবে। আর কোনো অবৈধ ক্লিনিক বা প্যাথলজি সেন্টার আছে কি না, সেটা কাগজপত্র না দেখে এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST