১৩ জানুয়ারী ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

বেনাপোল কাস্টমসে অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ১ হাজার ১৩ কোটি

মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি : দেশের সর্ববৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আমদানি কমে যাওয়া, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতা এবং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্কফাঁকি বৃদ্ধিই এই ঘাটতির প্রধান কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১২০ দশমিক ৫ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুলাই মাসে ৫০৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৪৪.০৪ কোটি টাকা। আগস্টে ৪৯৩ কোটির বিপরীতে আদায় ৪৪৭.৯৩ কোটি, সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটির বিপরীতে ৫১৩.৫৮ কোটি, অক্টোবরে ৬৪৫ কোটির বিপরীতে ৪৪৯.২৮ কোটি, নভেম্বরে ৭৫৫ কোটির বিপরীতে ৫৬৪.৪১ কোটি এবং ডিসেম্বর মাসে এক হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬০০.৮১ কোটি টাকা। প্রথম ছয় মাসে ঘাটতি থাকলেও বছর শেষে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে কাস্টমস সূত্র জানান।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। এছাড়াও আগের তুলনায় উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য যেমন শিল্প কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, যন্ত্রাংশ ও কেমিক্যাল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   সায়েন্সল্যাবে অবরোধ

তবে ব্যবসায়ীরা এ ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাণিজ্য নিরাপত্তায় দুর্বলতার সুযোগে কিছু অসাধু চক্র আমদানি পণ্য পাচার করে শুল্কফাঁকি দিচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় বন্দরে আমদানি কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এছাড়াও কাস্টমস ও বন্দরের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, জটিলতা ও অতিরিক্ত শুল্কায়নের কারণেও আমদানিকারকরা বেনাপোল বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

আমদানিকারক হাবিবুর রহমান বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমদানি পণ্য পাচার করে শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম জানান, বৈধ সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, দ্রত পণ্য খালাস এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আমদানি ও রাজস্ব আয় দুটোই বাড়বে।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন বলেন, কাস্টমসের নিচের স্তরের কিছু কর্মকর্তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পণ্যের অতিমূল্যায়ন করছেন। এর সঙ্গে বন্দরের নানা অনিয়ম যুক্ত হয়ে আমদানিকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে উচ্চ শুল্কযোগ্য পণ্য অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে। আর বেনাপোলের রাজস্ব কমছে।

আরও পড়ুনঃ   কুইক রেসপন্স টিমের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সেবা দান করা হবে

বেনাপোল স্থলবন্দর সূত্রের তথ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ১৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন পণ্য। অথচ আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আমদানি হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪২০ মেট্রিক টন পণ্য। এক বছরের ব্যবধানে আমদানি বাণিজ্যে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন জানান, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হয়, সেখানে বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২৫০ ট্রাকের মত। আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি শ্রমিক ও পরিবহন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সর্বশেষ তিন দিনে (১০, ১১ ও ১২ জানুয়ারি) বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে মাত্র ৭৮৩ ট্রাক পণ্য এবং রফতানি হয়েছে ২০১ ট্রাক পণ্য।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন জানান, শুল্কফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে জরিমানাসহ কাস্টমস আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা ও পণ্য খালাস দ্রত করতে কাজ করছি। আশা করছি, অর্থবছরের শেষ দিকে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজশাহীতে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

১

গোদাগাড়ীতে লগি-বৈঠার তাণ্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

২

বাঘায় জামায়তের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

৩

গোদাগাড়ীতে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা

৪

বাগমারায় অবৈধ পুকুর খননের দায়ে দুইজনের দণ্ড

৫

রাজশাহীতে ৩ কেজি গাঁজাসহ গ্রেফতার ১

৬

বাগমারায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত

৭

নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সেবা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

৮

নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ২৮

৯

নগরীতে চোরাই ল্যাপটপ-মোবাইলসহ গ্রেপ্তার ২

১০

বাগমারায় অনুমোদনহীন সার বিক্রির দায়ে জরিমানা

১১

নগরীতে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী গ্রেপ্তার

১২

ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা, এমপিপুত্র মিন্টু যুবদল থেকে বহিষ্কার

১৩

বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

১৪

রোগী পরিবহনের ভোগান্তি কমাতে অ্যাম্বুলেন্স পুল গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১৫

কারাগারে বিএনপি নেতা পিন্টুর মৃত্যু, তিন কারা কর্মকর্তাকে পিবিআই’র জিজ্ঞাসাবাদ

১৬

রাজশাহীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুই কোটি টাকার হেরোইন উদ্ধার

১৭

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার উদ্যোগে গাফিলতির সুযোগ নেই : ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার 

১৮

বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে বিভাগীয় বইমেলা, থাকছে ৮৯ স্টল

১৯

রাজশাহীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনের যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষকী উদযাপিত

২০

Design & Developed by: BD IT HOST