
স্টাফ রিপোর্টার : পুঞ্জীভূত দায় ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ প্রায় ৩০০ টাকা। অথচ বিক্রি করতে হয় মাত্র ১২৫ টাকায়। লোকসানের এমন ভার নিয়েই আবারও উৎপাদনে যাচ্ছে রাজশাহী চিনিকল।
আগামী ১৩ নভেম্বর শুরু হচ্ছে চলতি মৌসুমের আখ মাড়াই। ৬০ দিনে ৭০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পুরোনো সংকটের সমাধান হয়নি। কমছে আখ চাষের জমি। চিনিকলে আখ দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানও বাড়ছে। ফলে নতুন মৌসুমের শুরুতেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেয়ে লোকসানের চক্রে আটকে থাকার শঙ্কাই বেশি।
রাজশাহী চিনিকলের সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে আখের অভাব। পর্যাপ্ত আখ না পাওয়ায় বছরের পর বছর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। অনেক সময় নির্ধারিত মেয়াদের আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মাড়াই কার্যক্রম। এতে একদিকে কমছে উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়ের চাপ।
এবার আখের দাম মণপ্রতি ১১ টাকা বাড়িয়ে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩ নভেম্বর থেকে ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬০ দিন মাড়াই কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে আখ ক্রয়কেন্দ্রগুলো সচল করা হচ্ছে। নিবন্ধিত চাষিদের পাশাপাশি সাধারণ চাষিরাও চিনিকলে আখ সরবরাহ করতে পারবেন।
তবে শুধু আখের দাম বাড়িয়ে চাষিদের ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। চিনিকলে আখ সরবরাহের পর টাকা পেতে বিলম্ব এবং নানা ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে চাষিদের। অন্যদিকে স্থানীয় মাড়াইযন্ত্রে আখ থেকে গুড় তৈরি করে দ্রুত অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে অনেকেই চিনিকলে আখ না দিয়ে স্থানীয় গুড় উৎপাদনকারীদের কাছে বিক্রি করছেন।
আখের এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে গত কয়েক বছরের উৎপাদন চিত্রে। ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে ৬৭ কার্যদিবসে প্রায় ৬ হাজার ৯৩০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ১৭১ টন। আখের অভাবে ৪৪ দিনেই বন্ধ হয়ে যায় মাড়াই কার্যক্রম।
এর আগের ২০২৪-২৫ মৌসুমে চিনি উৎপাদন হয়েছিল ৩ হাজার ৫৬৭ টন। তার আগের তিন মৌসুমে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত, সব মিলিয়ে উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ৫৩৭ টন। প্রতিটি মৌসুমেই আখের সংকট উৎপাদন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
উৎপাদন কমলেও কমেনি লোকসান। ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী চিনিকলের লোকসান হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। তার আগের মৌসুমে এই অঙ্ক ছিল প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ মাড়াই মৌসুম পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান বা দায় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
লোকসানের আরেকটি বড় কারণ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে চিনির বিক্রয়মূল্যের বিশাল ব্যবধান। চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি কেজি চিনি বিক্রি করতে হয় ১২৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনিতে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় ১৭৫ টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও সারা বছরের পরিচালন ব্যয়। চিনিকলে আখ মাড়াই চলে বছরে মাত্র দুই মাসের মতো। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হয় সারা বছর। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় অব্যাহত থাকে। পুরোনো প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়াও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
চিনিকলের উৎপাদন সংকটের পেছনে আখ চাষের জমি কমে যাওয়াও বড় কারণ। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে। প্রায় এক দশকে আখ চাষের জমি কমেছে ২১ হাজার ৫২৭ হেক্টর। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি জমি থেকে হারিয়ে গেছে আখের চাষ।
চাষিরা এখন আখের পরিবর্তে সবজি ও অন্যান্য লাভজনক ফসল উৎপাদনে ঝুঁকছেন। স্থানীয়ভাবে গুড় তৈরির সুযোগও তাঁদের চিনিকল থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। মাড়াই মৌসুমে চিনিকলের অধিক্ষেত্রের মধ্যে গুড় তৈরির মেশিন জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আখ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
রাজশাহীর হরিয়ানে ১৯৬২ সালে চিনিকলটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৬৫ সালে। বছরে ২০ হাজার টন চিনি উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পরও লাভজনক ছিল। কিন্তু আশির দশকের শেষভাগ থেকে উৎপাদন কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
একসময় রাজশাহী অঞ্চলের আখচাষি ও স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই চিনিকল। এর উৎপাদন সচল থাকলে আখচাষিদের জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি হতো। কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আখের সংকট ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ প্রতিষ্ঠানটিকে ক্রমেই দুর্বল করেছে।
নতুন মৌসুমে ৭০ হাজার টন আখ সংগ্রহ এবং ৩ হাজার টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ৩ হাজার ৯০০ জন চাষি। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শুধু চুক্তি যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে আখের প্রাপ্যতা এবং সময়মতো চাষিদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করাও জরুরি।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাছুমা আকতার জাহান জানালেন, এবার প্রায় ৭০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ১৩ নভেম্বর থেকে মাড়াই শুরু হবে। এ জন্য আখ ক্রয়কেন্দ্রগুলো সচল করার প্রস্তুতি চলছে।
চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, পুঞ্জীভূত ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকাকে পুরোপুরি লোকসান বলা ঠিক হবে না। চিনিকলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও মানবসম্পদের মূল্য রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্য সমন্বয় করলে প্রকৃত নিট লোকসানের পরিমাণ কমে আসবে।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST