
স্টাফ রিপোর্টার : কারাগারে মৃত্যুর প্রায় ১০ বছর পর বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যু ঘিরে দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত এখন শেষপর্যায়ে। ঘটনার সময় কারা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
মঙ্গলবার রাজশাহীতে পিবিআই কার্যালয়ে তিন কারা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে এ জিজ্ঞাসাবাদ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মামলার আসামি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ ও সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম খান। এ ছাড়া মামলার সাক্ষী কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার হালিমা খাতুনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈকত হাসান বলেছেন, এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের কাজ শেষপর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
২০১৫ সালের ৩ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যান নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা-৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল।
পিন্টুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তখন থেকেই চিকিৎসা না পাওয়া ও কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তাঁর পরিবারের। তবে মৃত্যুর প্রায় এক দশক পর, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, এ ঘটনায় হত্যা মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই নাসিম উদ্দিন রিন্টু। রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৭ জনকে আসামি করা হয়। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের দায়িত্ব দেন পিবিআইকে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০০৯ সালের ৩ জুন পিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাদীপক্ষের দাবি, রিমান্ডে নির্যাতনের কারণে তিনি শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েন। তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০১৪ সালে পিন্টুর চিকিৎসার জন্যও উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছিল।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আদালত পিন্টুকে নিজ খরচে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ আই হসপিটালে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে তাঁকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ এবং পরে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ বাদীপক্ষের।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২ মে আদালতের চিঠি পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান চিকিৎসক রইছ উদ্দিন কারাগারে যান। তবে নিরাপত্তার অজুহাতে কারা কর্তৃপক্ষ পিন্টুকে চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ দেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর পরদিনই তাঁর মৃত্যু হয়। সে সময় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ ঘটনাটিকে ‘নরমাল ডেথ’ বা স্বাভাবিক মৃত্যু বলে উল্লেখ করেছিলেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাজি সেলিম, ইরফান সেলিম, তৎকালীন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন এবং কারা বিভাগের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুল মালেক রানা বললেন, পিন্টু হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। আদালত হত্যা মামলাটি গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।
দীর্ঘ সময় পর করা এ মামলায় এখন তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা। পিন্টুর মৃত্যুর আগে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ, কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে বাদীপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে কী তথ্য উঠে এসেছে, তা স্পষ্ট হবে প্রতিবেদন দাখিলের পর।
মন্তব্য করুন
Design & Developed by: BD IT HOST