১২ জুন ২০২৪
অনলাইন সংস্করণ

খাসির দামে বিক্রি হলো ৩৭ গরু

স্টাফ রিপোর্টার: ষাঁড়টির ওজন ১২ মণ। খামারের কর্মচারী মহাসিন আলী ডাক ধরলেন। সরকারি ডাক ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। ২০০ টাকা বাড়িয়ে ডাক ধরলেন তাজমুল। এরপর আরও ২০০ টাকা বাড়ালেন মেহেরাব। সবশেষ কালু আরও ২০০ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় ষাঁড়টি কিনে নিলেন। কোরবানির হাটে এই ষাঁড়টির দাম অন্তত ৪ লাখ টাকা। সোমবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী হাটে আঞ্চলিক দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারে এভাবেই নিলামে পানির দরে গরু বিক্রি হয়েছে। ছোট আকারের কোনো কোনো গরু ৩০ হাজার টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। কোরবানির বাজারে এ দামে একটি মোটাতাজা খাসিও পাওয়া যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট প্রতিবছরের মতো এবারও ছাগলের দামে সরকারি খামারের গরু কিনে নিয়েছে। নিলামে অংশ নিতে মোট ৩৫৭ জন ব্যাংক ড্রাফট (বিডি) জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিলামে ডাক ধরেছেন মাত্র পাঁচজন। অন্যরা নিলামে অংশ নেননি।
নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, খামারের কর্মচারী যে সরকারি দর ঘোষণা করছেন, তার চেয়ে ৬০০ টাকা বেশি দরে প্রতিটি গরু বিক্রি হচ্ছে। নিলামের শর্ত ছিল, প্রতিবার ডাক ধরার সময় সরকারি মূল্যের চেয়ে ন্যূনতম ২০০ টাকা করে বেশি বলতে হবে। সে অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২০০ টাকা করে বেশি ডেকেছেন। তিনজনে ২০০ করে মোট ৬০০ টাকা বাড়িয়ে গরু কিনে নিয়েছেন। প্রতিটি গরু নিলামে পরপর তিনজন ডাকার পর আর কেউ দর বলেননি। বাধ্য হয়ে ঘোষিত সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ৬০০ টাকা বেশিতে গরু বিক্রি করে কর্তৃপক্ষ।
খামার কর্তৃপক্ষ এদিন ৪টি ষাঁড়, ২১টি এঁড়ে বাছুর, ১০টি গাভি ও ১৬টি বকনা বাছুর মিলে মোট ৫১টি গরু নিলামের জন্য তোলে। এর মধ্যে ৩৭টি গরু একই সিন্ডিকেট পানির দরে কিনে নেয়। খামার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গরু কিনে দুপুরের পর একই স্থানে নিলামের মাধ্যমেই গরুগুলো বিক্রি করে এই সিন্ডিকেট। তাদের এ নিলামে সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারে। সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বেশি দরে তাদের গরু কিনতে হয়। খামার কর্তৃপক্ষের নিলামের মাধ্যমে খামার ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তা দুটি এঁড়ে বাছুর কিনে নিয়েছেন। ১২টি বকনা বাছুর বিক্রি হয়নি।
নিলামের শুরুতেই ৪৭০ কেজি ওজনের একটি ষাঁড় আনা হয়। ষাঁড়টির সরকারি ডাক হাঁকা হয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রথমেই কালু ষাঁড়ের দর হাঁকেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২০০। এরপর তাজমুল ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ এবং শেষে মেহেরাব ১ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা দর হাঁকেন। এরপর আর কেউ ডাকেননি। এক মিনিটের মধ্যে মেহেরাবের দরের ওপর ১, ২, ৩ ঘোষণা দিয়ে তাঁর কাছে গরুটি বিক্রি করা হয়। এ সময় উপস্থিত সিন্ডিকেটের শতাধিক সদস্য হাততালি দিতে থাকে। দ্বিতীয় লটে প্রায় একই ওজনের আরেকটি ষাঁড়ের সরকারি দর হাঁকা হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এরপর সেই তাজমুল, মেহেরাব ও কালু ২০০ টাকা করে বাড়িয়ে ষাঁড়টির দর হাঁকেন। শেষে ১ লাখ ২০ হাজার ৬০০ টাকায় ষাঁড়টি কেনা হয় কালুর নামে। আরেকটি বড় ষাঁড়ের দর হাঁকা হয় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আবার সেই মেহেরাব, কালু ও তাজমুল ২০০ টাকা করে বাড়িয়ে দর হাঁকেন। ১ লাখ ২৮ হাজার ৬০০ টাকায় এ ষাঁড়টি কেনা হয় তাজমুলের নামে। মেহেরাব, কালু ও তাজমুলের বাইরে একইভাবে ২০০ টাকা করে দর বাড়িয়ে গরু কিনেছেন উৎসব ও লতিফ। এই পাঁচজনের বাইরে আর কেউ নিলামে অংশ নেননি।
নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, কর্মকর্তাদের কাছে থাকা শিডিউলের খাতায় প্রতিটি গরুর ওজন এবং দর লেখা আছে। তবে যে দর লেখা আছে, তার চেয়ে ১ থেকে ২ হাজার টাকা করে বেশি ধরে সরকারি দর হাঁকা হয়। ৮৫ কেজি ওজনের একটি বকনার দর ছিল ২৩ হাজার ৩৭৫ টাকা। এটির দর হাঁকা হয় ২৫ হাজার। ১৩৩ কেজি ওজনের একটি এঁড়ের দর ছিল ৫৭ হাজার ৭৫০ টাকা। এটির দর হাঁকা হয় ৫৯ হাজার টাকা। ডাকে ৫৯ হাজার ৬০০ টাকায় এটি বিক্রি হয়।
শিডিউলের মূল্য অপেক্ষা বেশি দর হাঁকার বিষয়ে জানতে চাইলে খামারের উপপরিচালক ইসমাইল হক বলেন, জীবন্ত গরুর মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা। গরুর ওজন নেওয়া হয়েছে দুই মাস আগে। নিলামের প্রক্রিয়া শেষ করতে করতেই প্রায় দুই মাস চলে গেছে। এই সময়ের মধ্যে গরু খামারের খাবার খেয়েছে। একটু বড় হয়েছে। তাই শিডিউল অপেক্ষা এক–দুই হাজার টাকা বেশি দর ধরা হচ্ছে। এ টাকা সরকারি কোষাগারেই জমা হবে। নিলামের সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলফিকার মো. আখতার হোসেন। সিন্ডিকেট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘খামার থেকে যখনই গরু নিলামে তোলা হয় তখনই সিন্ডিকেট করে এলাকার কিছু লোক গরু কিনে নেয়। পরে তারা সেই গরু খামারেই বিক্রি করে।’
ড. জুলফিকার বলেন, অন্য কেউ নিলামে অংশ না নিলে তাঁদের কিছু করার থাকে না। নিলাম বাতিল করলেও লাভ হবে না। যখন নিলাম হবে, তখনই সিন্ডিকেট হবে। তিনি বলেন, ‘৩৫৭ জন বিডি জমা দিয়েছেন নিলামে অংশ নিতে। কিন্তু পাঁচজনের বাইরে কেউ ডাকলেন না। এমন নয় যে কেউ কাউকে ডাকতে বাধা দিয়েছে। বাধা যেন দিতে না পারে তার জন্য পুলিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও কেউ ডাকেনি।’
এই নিলামের সিন্ডিকেটে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমন মণ্ডল। কথা বলার জন্য তাঁকে দুবার ফোন কল করা হলে তিনি ধরেননি। তৃতীয়বার কেটে দেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিরাপত্তা জোরদারে নওগাঁ সীমান্তে নতুন ৩ বিজিবি ক্যাম্প

১

রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নতুন আমীরের শপথ গ্রহণ

২

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান রিটনের

৩

শাহ মখদুম (রহ.) ক্বারিয়ানা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিদর্শনে রাসিক প্রশাসক

৪

শিক্ষার্থীদের স্কাউটিংয়ের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: আসাদুল হাবিব দুলু

৫

সবার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

৬

স্বাধীন, শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান আইনমন্ত্রীর

৭

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের পঞ্চম চালান

৮

ইরানকে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

৯

ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৭ জনের মৃত্যু

১০

শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হার্ট সার্জারি চালুতে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

১১

কৃষিপণ্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসাই সরকারের লক্ষ্য : কৃষিমন্ত্রী

১২

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১৩

রাজশাহীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২এর উদ্বোধন

১৪

রাসিক প্রশাসকের সঙ্গে শিক্ষানবিশ সহকারী কমিশনারদের মতবিনিময়

১৫

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় স্বাগত জানালেন রাসিক প্রশাসক

১৬

নগরীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ১ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

১৭

নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ৯

১৮

পুঠিয়ায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস সিজন-২-এর শুভ উদ্বোধন

১৯

ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু হচ্ছে ১৯ নভেম্বর

২০

Design & Developed by: BD IT HOST