২৯ জানুয়ারী ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

যশোর ৮৫-১ (শার্শা) : সীমান্ত জনপদে দুই অপরাজিতের লড়াই

মনির হোসেন, বেনাপোল প্রতিনিধি: যশোর-১ (শার্শা)ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসনে ঘিরে রাজনীতির মাঠে বাড়ছে উত্তাপ। ভোটের মাঠে দুই অপরাজিত প্রার্থী এবার আসন্ন নির্বাচনে সীমান্ত জনপদ শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে যশোর-১ আসন গঠিত।

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল এই আসনে অবস্থিত। যশোর-১ আসনে একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছেন। তিন লাখ ১১ হাজার ভোটারের এ আসনে ইতোমধ্যে দুই প্রার্থীই নিজেদের প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। ভোট যুদ্ধে প্রভাবশালী বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীকে ঘিরে স্থানীয় জনপদে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোটের দুই জন প্রাথী থাকলেও তাদের নেই এলাকায় পরিচিতি। এই দুই প্রার্থীর শুধু মাত্র মাইকে প্রচার সীমাবদ্ধ।

সব রাজনৈতিক দলের কাছে আসনটির গুরুত্ব বেশি। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি তিনবার, স্বতন্ত্র ও জামায়াত একবার করে বিজয়ী হয়েছে।

নির্বাচনের তপশীল ঘোষণার আগে থেকেই মাঠে আছে প্রার্থীরা। প্রতীক হাতে পেয়ে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দলের মনোনয়ন প্রতাশীরা।

এই আসনে আওয়ামী লীগ দৃশ্যত অনুপস্থিত থাকায় নির্বাচনী প্রতিযোগিতা মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

৫ আগস্টের পর মাঠে সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের। এবার এ আসনে পাল্টে যেতে শুরু করেছে রাজনীতির দৃশ্যপট। হাসিনা সরকারের পতনের পর এ আসনে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের পর যশোর-১ আসনে বিএনপি-জামায়াত পুনরায় উত্থানকে রাজনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার জনগণের আকাঙ্খা, দীর্ঘ দমন-পীড়নের ইতিহাস এবং বিরোধী দলগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আসনটি এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘নির্বাচনী হটস্পটে’।

এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার তিন লাখ ১১ হাজার ৬৩৩ জন। পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৭ জন। মহিলা ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮২৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ৩ জন। আওয়ামীলীলের সাধারন কর্মীরা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারলে, তৃণমূল আওয়ামীলীগের ভোট পড়বে বিএনপি না জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে সেটা হিসেব নিকেশ করছে দুই দলই। সেক্ষেত্রে এই আসনটি বিএনপির ঘরে যাবে না জামায়াতের ঘরে এমনটি মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুনঃ   আ.লীগের মাসব্যাপী কর্মসূচির প্রতিবাদে পুঠিয়ায় বিএনপির বিক্ষোভ

এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন চার নেতা। প্রথমে দল মনোনয়ন দেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে। পরে চুড়ান্ত মনোনয়ন পান দলের শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন। জামায়াতে ইসলামী‘র একমাত্র প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজীজুর রহমান। তিনি দলের একমাত্র প্রার্থী হওয়ায় নিজের অবস্থানে বেশ আত্মবিশ্বাসী। ইতিমধ্যে মাওলানা আজিজুর রহমানের পক্ষে নির্বাচনী ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে নুরুজ্জামান লিটনের পক্ষে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা বিভিন্নভাবে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে জনসমর্থন আদায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রকাশ্য সভা থেকে শুরু করে অনলাইন প্রচারণা-কোনো কিছুই বাদ রাখছেন না। চলছে কেন্দ্রভিত্তিক কর্মীসভা, আলোচনা ও মতবিনিময়ও। দলের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচন না করলে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বড় একটি অংশ বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে যেতে পারে বলে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতারা আশা করছেন। প্রত্যেকেই দলের বার্তা ও নিজের ইশতেহার, প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় যাচ্ছেন। সামাজিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংগঠনিক নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। এই দুই দল ছাড়াও এই আসনে জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বখতিয়ার রহমান প্রাথী হলেও তাদের নেই এলাকায় পরিচিতি। এই দুই প্রার্থীর শুধু মাত্র মাইকে প্রচার সীমাবদ্ধ।

শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তরুণ নেতা নুরুজ্জামান লিটন তরুণ ভোটারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। আওয়ামী আমলে নাশকতার মামলায় কারাবরণ করলেও তার বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির অভিযোগ নেই, যা তাকে গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার অবস্থান অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন।

বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী নুরুজ্জামান লিটন বলেন, আমি শার্শা উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলাম। পরে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমার নামে বেনাপোল, শার্শা, যশোর, ঢাকায় খুলনায় রাজনৈতিক মামলা আছে। দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে দলের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছি। মাঠ পর্যায়ে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। তাই সকল দিক বিবেচনা করে দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। দল ও দলের অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ কর্মীরা এক যোগে কাজ করে যাচ্ছেন। আমি জয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।

আরও পড়ুনঃ   সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোটে কোনো বাধা নেই: সালাহউদ্দিন আহমদ

এদিকে এই আসনে ১৯৮৬ সালে জামায়াতের প্রার্থী এ্যাড. নূর হুসাইন সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা আজীজুর রহমান। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আফিল উদ্দিনের কাছে প্রায় ৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। সেই মাওলানা আজিজুর রহমান আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থী হলেও তার সর্বদলীয় জনপ্রিয়তা রয়েছে এলাকায়।

তিনি বলেন, আওয়ামীলীগের শাসনের সাড়ে ১৫ বছরে আমরা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারিনি। কিন্তু পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অগোচরে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি। জামায়াতের প্রতি সমর্থনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। ভালো সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি অতীতের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা বেড়েছে। মানুষ চায়, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এজন্য জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। তিনি বলেন, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, ঘুষ ও দুর্নীতিমুক্ত শার্শা গড়তে চাই। বেনাপোল বন্দরকে দেশ উন্নয়নের সোপান করে তুলতে চাই।

শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে একটু ভাল। তবে কিছু কিছু এলাকায় এখনো রাস্তা পাকা হয়নি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ধূলোর রাস্তা কাঁদায় পরিণত হয়। এছাড়াও গ্রুপিং লবিং আছে সব গ্রামে। নির্বাচনে এ সমস্ত সমস্যাগুলোই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন প্রার্থীরা। প্রার্থীরা আশ্বাস দিচ্ছেন তিনি নির্বাচিত হলেই এসব সমস্যা থাকবে না। স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুতের চেয়েও সীমান্ত এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা চোরাচালান ও সন্ত্রাস। শার্শা উপজেলার সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসীরা দাপটের সঙ্গে বিচরণ করে। প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকার সমাবেশে বলছেন তিনি নির্বাচিত হলে শার্শায় কোন সন্ত্রাস হতে দেবেন না। সে যে দলেরই হোক না কেন সন্ত্রাস করে কেউ রেহাই পাবে না। শার্শার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

পক্ষ-বিপক্ষ, মত-দ্বিমত আর উৎসাহ উদ্দীপনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে যশোর-১ আসনের নির্বাচনী পরিবেশ। ভোটাররা মনে করছেন, এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কে অপরাজিত থাকছেন তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারী মধ্যরাত পর্যন্ত।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথমবার আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজশাহী আসছেন তারেক রহমান : এখন শুধু অপেক্ষার পালা

১

পূজামন্ডপ দেখতে সৈয়দপুর পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

২

নাটোরে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষ, নিহত বেড়ে ১৪

৩

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সাক্ষাৎ

৪

মানিকগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের শাড়ি বিতরণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে রয়েছে সরকার : খাদ্যমন্ত্রী

৫

নগরীতে পুলিশের অভিযানে ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

৬

৫ মাস পর অবশেষে রাজের সঙ্গে দেখা দিলেন শুভশ্রী

৭

সারাজীবন ঝামেলা হবে, এটা মেনে নিয়েছি : পরীমনি

৮

সৌদি আরবে ১০ মাসে ১৮৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, অধিকাংশই মাদক সংক্রান্ত

৯

ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে হবে: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

১০

ক্যানসার চিকিৎসায় প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করা হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১১

ডাক বিভাগের আধুনিকায়নে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে: ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী

১২

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে পাঁচ বিষয়ে অগ্রাধিকার : প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

১৩

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত অক্টোবরেই আসবে, আশা বাণিজ্যমন্ত্রীর

১৪

মিষ্টি কেনার পথে দুর্ঘটনা, বাড়ি না ফিরে কারাগারে রাবি শিক্ষার্থী রিজন

১৫

দুর্গাপুরে ট্রাক থেকে ৭৩৭৫ ইয়াবা উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১

১৬

নগরীতে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

১৭

নগরীতে মাদকবিরোধী অভিযানে নারীসহ গ্রেপ্তার ২

১৮

প্রথমবার রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১৯

নগরীতে মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ১৭

২০

Design & Developed by: BD IT HOST