১০ জুলাই ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

ক্লাব থেকে শিক্ষা বিপ্লব: বাগমারার কাতিলা সবুজ সংঘ আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ আজ এক আলোকবর্তিকা

স্টাফ রিপোর্টার, বাগমারা : একসময় যেখানে শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, উচ্চশিক্ষা ছিল অনেকটাই অধরা—সেই প্রত্যন্ত গ্রাম আজ পরিচিত একটি আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার যোগীপাড়া ইউনিয়নের কাতিলা গ্রামে গড়ে ওঠা কাতিলা সবুজ সংঘ আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ এখন শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ জনপদের শিক্ষা, সামাজিক পরিবর্তন ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো, একই ক্যাম্পাসে পরিচালিত হচ্ছে পাঁচটি শিক্ষা কার্যক্রম—প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভোকেশনাল শাখা, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট (বিএম) শাখা এবং কলেজ শাখা। বর্তমানে প্রায় সাত বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা এই শিক্ষা কমপ্লেক্সে অধ্যয়ন করছে ১২০০-এর বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১০৫ জন। একই সঙ্গে এখানে এসএসসি ও এইচএসসি সমমানের পরীক্ষাকেন্দ্রও রয়েছে, যা এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুবিধা সৃষ্টি করেছে।

এই শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা হয় ১৯৮৩ সালের ২০ ডিসেম্বর। গ্রামের সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে কয়েকজন শিক্ষানুরাগী যুবকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় কাতিলা সবুজ সংঘ ক্লাব। এর নেতৃত্বে ছিলেন শিক্ষানুরাগী মজনু মোহাম্মদ। শুরুতে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা উপলব্ধি করেন—একটি সমাজকে বদলে দিতে শিক্ষার বিকল্প নেই।

সেই উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় কাতিলা সবুজ সংঘ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। মাত্র ছয়জন শিক্ষক-কর্মচারী ও ২০৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। শুরু থেকেই ছেলে ও মেয়ে উভয়ের শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ কন্যাশিক্ষা বিস্তারে নেওয়া উদ্যোগ এলাকাবাসীর প্রশংসা কুড়ায়।

আরও পড়ুনঃ   লন্ডনে ফিরে গেলেন জুবাইদা রহমান

শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ১৯৯৮ সালে বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। এরপর ২০০০ সালে স্থানীয় যুবকদের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়। ফলে কাতিলা ও আশপাশের গ্রামের শিশুদের জন্য একই ক্যাম্পাসে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

পরবর্তী সময়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ দিতে চালু করা হয় ভোকেশনাল শাখা। এরপর ২০০২ সালে বিএম শাখা এবং ২০০৩ সালে উচ্চমাধ্যমিক বা কলেজ শাখা চালু হয়। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় কাতিলা সবুজ সংঘ আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্য মজনু মোহাম্মদ প্রথমে প্রধান শিক্ষক এবং পরে ২০০০ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিবছর এসএসসি, এইচএসসি, ভোকেশনাল ও বিএম পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির সুনাম আরও বৃদ্ধি করছে। এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে দেশ-বিদেশের সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও পড়ুনঃ   মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করতে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

স্থানীয়দের ভাষ্য, কাতিলা সবুজ সংঘ আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ শুধু শিক্ষার সুযোগই সৃষ্টি করেনি, বদলে দিয়েছে পুরো এলাকার সামাজিক বাস্তবতা। একসময় যে পরিবারগুলো মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনাগ্রহী ছিল, এখন তারাই সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করছে। বাল্যবিবাহ কমেছে, বেড়েছে শিক্ষার হার, সামাজিক সচেতনতা এবং নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস।

অধ্যক্ষ মজনু মোহাম্মদ বলেন, “গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই আমরা এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলাম। স্থানীয় মানুষের জমি, শ্রম ও আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি। ২০২৭ সালে আমার কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটবে। তবে সবচেয়ে বড় তৃপ্তি হলো, এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।”

গ্রামের একটি ছোট্ট ক্লাব থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কমপ্লেক্সে রূপ নিয়েছে। কাতিলা সবুজ সংঘ আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রমাণ করেছে—দূরদর্শী নেতৃত্ব, সামাজিক ঐক্য এবং শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার থাকলে প্রত্যন্ত গ্রামের বুকেও গড়ে উঠতে পারে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, যা বদলে দিতে পারে একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও শোক ,প্রবীণ সাংবাদিক সাইদুর রহমানের দাফন সম্পন্ন

কৌশানি এবার ‘চন্দ্রমুখী’

হুঁশিয়ারি আইআরজিসির, ইরানের নতুন অস্ত্র দেখে বিশ্ব অবাক হবে

জ্বালানির দাম দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশে কত?

ধর্ষণের ১৫ মিনিটের মধ্যেই হত্যা করা হয় শিশু কলিকে

বাঘায় জুথি হত্যা মামলার আসামি স্বামী জহুরুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ

নগরীতে পরিত্যক্ত অবস্থায় পিস্তলের ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার

রাজশাহীতে ৪২৭ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২

রেলওয়ের প্রতিপক্ষ হতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা : জিএম

পিপিএম-সেবা পদক পেলেন আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির

১০

রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতি সাইদুর রহমানের জানাজা অনুষ্ঠিত

১১

সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

১২

স্বাস্থ্যখাতের ওপর সরকারের বড় সাফল্য নির্ভর করছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১৩

রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতির মৃত্যুতে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা রাজশাহী জেলার শোক প্রকাশ

১৪

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

১৫

রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে বিপিজেএ রাজশাহী শাখার গভীর শোক

১৬

বাগমারায় মাছের পোনা অবমুক্তকরণের উদ্বোধন করলেন এমপি ডা: আব্দুল বারী

১৭

জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ

১৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে প্রায় ১৪ কেজি গাঁজা উদ্ধারসহ গ্রেফতার ১

১৯

কলকাতা- বেনাপোল -খুলনা বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুই বছর পর চালু হচ্ছে

২০

Design & Developed by: BD IT HOST