২৬ ডিসেম্বর ২০২৫
অনলাইন সংস্করণ

রাজশাহীতে ভয়াবহ পানিসংকট গভীরতর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামলেও থামছে না অবাধ ব্যবহার

অবাধ ও অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন।

মমিনুল ইসলাম মুন, স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নামলেও কমছে না পানির ব্যবহার। বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে অবাধ ও অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন। খরাপ্রবণ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ইতোমধ্যে পানিসংকট চরম আকার ধারণ করেছে।

সরকারি তথ্যমতে, রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলার মোট ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে আগামী ১০ বছরের জন্য এসব মৌজাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি গেজেটের কপি হাতে পেয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

গেজেট অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে এসব ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা অবস্থিত। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল প্রায় ২৬ ফুট নিচে। ক্রমাগত ও অপরিকল্পিত উত্তোলনের ফলে ২০১০ সালে তা নেমে আসে ৫০ ফুটে। ২০২১ সালে পানির স্তর আরও নিচে নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৬০ ফুটে। বর্তমানে বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১১৩ ফুটেরও নিচে নেমে গেছে।

আরও পড়ুনঃ   বাঘায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬-এর শুভ উদ্বোধন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল রাখতে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং গভীর নলকূপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পানি উত্তোলন নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, অগভীর বা সেমিডিপ নলকূপে উত্তোলিত পানির মাত্র ৩০ শতাংশ কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়, বাকি ৭০ শতাংশ অপচয় হয়। বিপরীতে গভীর নলকূপে উত্তোলিত পানির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য থাকে।

এদিকে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজশাহী অঞ্চলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ ব্যক্তি মালিকানায় গভীর ও অগভীর নলকূপ বসিয়ে ব্যাপক হারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিকাজের জন্য হাজার হাজার নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষই রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় প্রায় ১৫ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছে।

পানি সংকটের তীব্রতায় তানোর ও গোদাগাড়ী এলাকায় একের পর এক বোরহোল খনন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ১৬০ থেকে ২০০ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়েও পানির সন্ধান মিলছে না। এসব ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত খোলা রেখেই নতুন করে আবার খনন করা হচ্ছে। সম্প্রতি তানোরে এমন একটি পরিত্যক্ত গর্তে পড়ে দুই বছরের শিশু সাজিদ হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর মাটির ৫০ ফুট নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই দুর্ঘটনার পর রাজশাহী বিভাগে স্থাপন করা গভীর নলকূপের তথ্য তলব করেছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার উন্নয়ন করপোরেশনের সেচ বিভাগকে চিঠি দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পরিত্যক্ত পাইপের মুখ সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাইলেন সাবেক চেয়ারম্যান মোমিনুল হক

ওয়াটার রিসোর্স প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের তত্ত্বাবধানে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে রাজশাহী অঞ্চলে পানি সংকটাপন্ন এলাকার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ মিটারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার একটি স্থানে সর্বোচ্চ ৪৬ দশমিক ৮৭ মিটার গভীরতায় পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে।

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের মোট ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত ৮৭টি ইউনিয়নকে অতি উচ্চ ও উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পোরশা উপজেলার ছয়টি এবং নাচোল উপজেলার চারটি ইউনিয়নের সবকটিই অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অব্যাহতভাবে নিচে নামতে থাকায় ২০১৫ সালে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ব্যক্তি মালিকানায় সেমিডিপ নলকূপ স্থাপন অব্যাহত রয়েছে। শুধু গত বছর তানোর উপজেলাতেই উপজেলা সেচ কমিটির অনুমোদনে ৩২টি সেমিডিপ নলকূপ বসানো হয়েছে।

তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান জানান, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য খোঁড়া পরিত্যক্ত গর্তগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে অপরিকল্পিতভাবে কাউকে গভীর বা সেমিডিপ নলকূপ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরি সারওয়ার জাহান বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির সম্মিলিত ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ

১

নগরীতে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী সেলিমসহ গ্রেপ্তার ৩

২

নগরীতে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ২

৩

রাজশাহীতে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত

৪

বড়াইগ্রামে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বিষয়ক প্রেস কনফারেন্স

৫

পুঠিয়ায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহবিষয়ক অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত

৬

রুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুটি পুরস্কার অর্জন

৭

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও, ফটকে তালা

৮

মালিহা পারভেজ রিদির সাফল্য, অর্জন করলেন বাংলাদেশ পুলিশ মেধাবৃত্তি

৯

কন্যা শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষা নিশ্চিত ছাড়া উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয় : জেলা প্রশাসক

১০

সিনেমা হলের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার : তথ্যপ্রতিমন্ত্রী

১১

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ এর আর্থিক অনুদান প্রদান

১২

ফরিদপুরে প্রবাসী স্ত্রীকে নির্যাতন, চুল কেটে পাঠানো হলো বাবার বাড়ি

১৩

জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার

১৪

দুষ্কৃতিকারীদের কোনো দল নেই : রাজশাহীতে ভূমিমন্ত্রী

১৫

দখলমুক্ত ফুটপাত, নাগরিকদের স্বস্তি

১৬

নগরীতে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ১৯

১৭

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে শিশু একাডেমির কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে : ডা.জাহিদ

১৮

জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করে শিশুদের সুনাগরিক হওয়ার আহ্বান : স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

১৯

ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ : বাণিজ্যমন্ত্রী

২০

Design & Developed by: BD IT HOST