২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
অনলাইন সংস্করণ

ভোলাহাটে “অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৪” ঘোষিত হলো ৫ সফল নারী!

এম এস আই শরীফ, ভোলাহাট(চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা তথা দেশের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট ১টি উপজেলার নাম ভোলাহাট। মান্দাত্তা আমল থেকেই পিছিয়ে পড়া, সাসপেন্ড এরিয়া নামে পরিচিত ছিল এই উপজেলাটি। কালের বিবর্তনে বর্তমান প্রেক্ষাপট অনেকটাই হয়েছে পরিবর্তন। এগিয়ে গেছে পূর্বের চেয়ে শিক্ষাখাত। আর এই শিক্ষা খাতকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়েছে উপজেলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবলা, সহজ-সরল, গাঁ-এর বধুরাও।

এই নারী বা বধুদের বিভিন্ন জীবন-জীবিকার তাগিদে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অজো-পাড়া-গাঁ-এর নারীরা। যাকে আগে বলা হতো “জয়িতা নারী”। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ নারীদের নামকরণ করা হয়েছে ” অদম্য নারী”। এই অদম্য নারী হিসেবে ভোলাহাটের ৫ জন বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, সমাজে নির্যাতিতা আর কেউবা সফল জননী এবং শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অদম্য ৫ জন নারী রাজশাহী বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়েছেন, তাদেরই জীবন কাহিনী লিপিবদ্ধ করবো।

১। সফল জননী নারীঃ কুলসুম আরা-
উপজেলা মহিলা বিষয়ক দপ্তরের পাওয়া সূত্রমতে, সফল জননী নারী হিসেবে রয়েছেন, উপজেলার ৩নং দলদলী ইউনিয়নের নামো মুশরীভূজা গ্রামের এস্তাব আলী বিশ্বাসের মেয়ে মোসাঃ কুলসুম আরা (৬০)। তিনি বলেন, আমি বাবার সংসারে ৭ম শ্রেণীতে থাকাতে ১৯৭৪ সালে মা বাবা আমাকে বিয়ে দেন। শ্বশুড়ের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভাল ছিলো না। স্বামী ডিগ্রিতে অধ্যায়ণরত। শ্বশুড় বাড়ীর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিলো ১৫ থেকে ২০ জন। কারণ বলতে গেলে শ্বশুড় মশাইয়ের ৩ জন স্ত্রী ছিল।
স্বামী নুরুল ইসলামের হঠাৎ করেই চাকরী হয়। তখন আমার ৪ ছেলেমেয়ে। যৌথ পরিবারের স্বামী একমাত্র উপার্জনের উৎস্য। স্বামীর চাকরী হলেও শ্বশুড় ও আমাদের সকল সদস্য নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার অতি কষ্টে চালালেও নিজের ছেলেমেয়ের খরচ চালানো কঠিন ছিলো। এমতাবস্থায় ৪ ছেলেমেয়ের পড়ালেখার ও পরিবারের খরচ চালাতে স্বামী হিমসিম খেতো এবং কোন কোন সময় অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করতে হয়েছে।
এমনকি ১/২টি কাপড়ে সারা বছর চালাতে হয়েছে ও ঘরের ধান-চাল বিক্রি করেও ছেলেমেয়ের ফরম ফিলাপ করেছি কয়েকবার। সে সময় ধান, চাল, আটা, ছাতু কুটানোর মেশিন থাকলেও টাকার অভাবে আর ছেলেমেয়েদের মানুষ করার স্বার্থে ভোর রাতে উঠে ঢেঁকিতে ধান ভেঙ্গে চাল ও সেই চাল যাঁতায় পিষে আটা করে খাবারের ব্যবস্থা করেছি। সে সাথে অভাব দূর করতে সংসারে গরু-ছাগলসহ হাঁস মুরগী পালন করেছি।
দুঃখের কথা অনেক, যা আমার বর্তমান সম্মান, পরিবেশ ও সময়ের সাথে নিজেকে ছোট করতে চাই না। আমার ৪ ছেলেমেয়ের মধ্যে-বড় মেয়েকে বি,এ পাশ করিয়ে প্রাইমারী স্কুলে সহকারী শিক্ষক। বড় ছেলেকে এম, এ পাশ করিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক। ছোট ছেলেকে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে বিএসসি পাশ করিয়ে এখন মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স গ্রুপে (বাংলাদেশে) কর্মরত আছে। ছোট মেয়েকে বি, এ পাশ করিয়ে প্রাইমারী স্কুলের সহকারী শিক্ষক। বর্তমানে আমি ও আমার পরিবার নিয়ে আলহামদুলিল্লাহ্ খুব ভাল আছি।

আরও পড়ুনঃ   নিয়ামতপুরে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত

২। শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে সফল নারীঃ হালিমা খাতুন-
মোসাঃ হালিমা খাতুন (৩১) তার ভাষায় বলেন, আমি ১৯৯৩ সালে ১০ অক্টোবর এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম। আমরা ৩ ভাইবোন বাবার সংসারে। বাবা-মা নিরক্ষর মানুষ। বাবা কৃষি কাজ করেন আর মা গৃহিনী। এ সংসারে বহু ত্যাগ তিতিক্ষা করে পড়াশুনা করতে হয়েছে আমাকে। প্রাইমারিতে লেখাপড়ার মান ভাল আর আমার আগ্রহ দেখে তাদের অনুপ্রেরণা জোগিয়েছে আমাকে। হাইস্কুলে অধ্যায়নরতে ৩, ৪, ৫ রোল নম্বর থাকতো। ৯ম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় মনে পণ করি, ১০ম শ্রেণীতে আমাকে ফার্স্ট হতে হবে। পরে তাই হয়ে ছিল। আমার কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী আরো অনুপ্রাণিত করায় এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করি। এরপর শিক্ষকদের পরামর্শে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এডমিশন পরীক্ষা দিই এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হবার সৌভাগ্য হলে, সেখান থেকে মাস্টার্স শেষ করি। তারপর চাকরীর জন্যে উঠেপড়ে লাগি। ২০২০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী প্রাইমারী স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি।
বাবা-মায়ের অসহায় মুখ, তাদের দোয়া ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা আর প্রত্যাশা আমাকে সৎ সাহস যোগিয়েছে। আমাকে সফলতার মুখ দেখিয়েছে। আমি মহান আল্লাহ্ তা’আলার অশেষ মেহেরবানীতে কিছু হলেও করতে পারছি। আমাদের ভাইবোনদের পড়ালেখা করাতে গিয়ে বাবাকে রৃণের বোঝা টানতে হয়েছে। আমার চাকরী পাবার পরে বাবাকে রৃণমুক্ত করার চেষ্টা করেছি। বাবার স্বপ্ন ছিল আমি যেনো বাবাকে একটি পাকা বাড়ী করে দিই। বাবার সে স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আমি যেনো সততার সাথে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারি এবং আমার পেশাকে নেশায় পরিণত করতে পারি। এ দোয়া সকলের কাছে চাই।

৩। নির্যাতনের বিভিষিকায় সাফল্য অর্জনকারী নারীঃ রাজিয়া খাতুন-
সমাজে নির্যাতিতা হয়ে সাফল্য কুড়িয়েছেন উপজেলার ৩নং দলদলী ইউনিয়নের ময়ামারী গ্রামের এনতাজ আলীর মেয়ে মোসাঃ রাজিয়া খাতুন (৪৯) এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি বাবার সামান্য আয়ে পরিবারে থাকা ৮জন সদস্য তাদের সকলের খাবারের পাশাপাশি বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষা এই মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে আমার বাবার পক্ষে বড়ই কষ্টসাধ্য ছিল। বাবার ভিটামাটি ছাড়া কোন জায়গা-জমি না থাকায় আমার নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করতে ভীষণ কষ্ট হয়। পরে বাবা-মা বিয়ে দিলে সেখানে ২ সন্তান হওয়ার পরে স্বামী মারা যায়। মেয়ে হয়ে সংসার জীবন চালাতে গিয়ে বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। এখানেও স্বামী আমার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে হরহামেশা। এভাবে নির্যাতিত হয়ে আমার সন্তানদের লালনপালন ও তিনবেলা খাবারের উদ্দেশ্যে লোকের বাড়ী বাড়ীতে কাজ করতে থাকি। পরে অতি কষ্টে টাকা জোগাড় করে একটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে কাজ আরাম্ভ করি। সে থেকেই অদ্যাবধি আমার সংসার ভালভাবেই চলছে এবং মহান আল্লাহর রহমতে ভাল ভাবেই দিনাতিপাত করছি।

আরও পড়ুনঃ   গোদাগাড়ীতে পদ্মার পানি ব্যবহার করে সেচ কার্যক্রম পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা

৪। সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান অর্জনকারী নারীঃ সাবেরা খাতুন-
লিখিত বক্তব্যে উপজেলার ভোলাহাট সদর ইউনিয়নের গোপিনাথপুর গ্রামের মৃত সামসুদ্দীনের মেয়ে মোসাঃ সাবেরা খাতুন (৪৭) এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি বাবার সামান্য আয়ের পরিবারের ৯ জন ভাইবোনের বাবা-মা মোট ১১ জন সদস্যের সংসারে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করতাম। বাবা সামান্য বেতনের গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিনের চাকরী করতো। আমরা তিনবেলা পেট ভোরে খেতে ও ঠিকমত পোষাক-আষাক পেতাম না। বাবা আমাদের সব ভাইবোনদের পড়ালেখা করাতে পারিনি আর্থিক অনটনের জন্য। আমি যখন দশম শ্রেণীতে তখন আমার বিয়ে হয়। শ্বশুড় বাড়ীতে আসার পর শুরু হয় আমার উপর ষ্টিমরোলার। এভাবেই অতিকষ্টে দিন যায় বছর বছর শেষে আমার ৩টি সন্তান হয়। ১ ছেলে ও ২ মেয়ে। তারপরে আমার আরো কষ্টের আকাশে মেঘ নেমে আসে। স্বামী এক সময় আমাকে ছেড়ে অজানার উদ্দ্যেশ্যে পাড়ি জমায়। সে সময় আমাকে ও আমার ছেলেমেয়েদের দেখার কেউই ছিলো না। পরে আমি স্থানীয় ব্র্যাক স্বাস্থ্যকর্মী পদে যোগদান করে সন্তানদের লেখাপড়া ও ভরনপোষণ চালাই। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। বাকী দু’সন্তান তারা এখন লেখাপড়া করছে। বর্তমানে আমি জনসেবা মূলক কাজে নিয়োজিত এবং আমি আগের তুলনায় এখন খুব ভাল আছি।

৫। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারীঃ মানুয়ারা বেগম-
অর্থ উপার্জন করে সাফল্য পেয়েছেন উপজেলার সদর ইউনিয়নের আরেক নারী শিকারী গ্রামের মৃত জয়নাল আবেদীনের মেয়ে মোসাঃ মানুয়ারা বেগম (৫২) এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি বাবার সংসারে ৪ ভাই ও ৪ বোন। বাবা-মা মোট ১০ জন সদস্যের পরিবারে বাবা একজন আদর্শ কৃষক হিসেবে এতোজন মুখের আহার জোগাড় করতে খুবই কষ্ট হতো। বাবা-মা আমার বিয়ের কাজ আসলে ১৯৭২ সালে শিকারী গ্রামের তরিকুল ইসলামের সাথে মাদ্রাসায় ১০ম শ্রেণী পাশ করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। স্বামীর সামান্য আয়ে সংসারের উন্নতি ঘটে না। এভাবে সংসার চলাকালীন ২০০০ সালে পুত্র সন্তানের মা হই। সংসারের সদস্য সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে ব্যয় বেড়ে গেলে স্বামীর পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাড়ায়। আমি এরই মধ্যে বুদ্ধি করে সংসারের অভাব দূর করতে ১টি গাইগরু ছাগলসহ হাঁসমুরগী পালন করতে থাকি। আমার এ সমস্ত গবাদিপশু ও হাঁস মুরগীর আয় থেকে ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ চালাই। পরে ১টি গরু থেকেই ধীরে ধীরে ১৫টি গরুর খামারের মতো তৈরী করি। এক সময়ে গরু হৃষ্টপুষ্ট হলে বিক্রি করে জমি জায়গা খরিদ করি। এখন আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতেই অনেক ভালো জীবন অতিবাহিত করছি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতীয় কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ

১

নগরীতে কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী সেলিমসহ গ্রেপ্তার ৩

২

নগরীতে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ২

৩

রাজশাহীতে রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত

৪

বড়াইগ্রামে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বিষয়ক প্রেস কনফারেন্স

৫

পুঠিয়ায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহবিষয়ক অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত

৬

রুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের দুটি পুরস্কার অর্জন

৭

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও, ফটকে তালা

৮

মালিহা পারভেজ রিদির সাফল্য, অর্জন করলেন বাংলাদেশ পুলিশ মেধাবৃত্তি

৯

কন্যা শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষা নিশ্চিত ছাড়া উন্নত জাতি গঠন সম্ভব নয় : জেলা প্রশাসক

১০

সিনেমা হলের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার : তথ্যপ্রতিমন্ত্রী

১১

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ এর আর্থিক অনুদান প্রদান

১২

ফরিদপুরে প্রবাসী স্ত্রীকে নির্যাতন, চুল কেটে পাঠানো হলো বাবার বাড়ি

১৩

জার্মান পর্যটকের চুরি হওয়া ল্যাপটপ উদ্ধার

১৪

দুষ্কৃতিকারীদের কোনো দল নেই : রাজশাহীতে ভূমিমন্ত্রী

১৫

দখলমুক্ত ফুটপাত, নাগরিকদের স্বস্তি

১৬

নগরীতে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার ১৯

১৭

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে শিশু একাডেমির কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে : ডা.জাহিদ

১৮

জিয়াউর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করে শিশুদের সুনাগরিক হওয়ার আহ্বান : স্থানীয় সরকারমন্ত্রী

১৯

ইন্দোনেশিয়ার সাথে বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ : বাণিজ্যমন্ত্রী

২০

Design & Developed by: BD IT HOST