শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য লইয়া উদ্বেগ

348

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক যৌথ গবেষণায় বলা হইয়াছে, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৮ বত্সরের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের মধ্যে মানসিক রোগের প্রকোপ ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ১৮ বত্সরের নিচে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ইহার প্রকোপ ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাত্ শিশু-কিশোররাই তুলনামূলকভাবে মানসিক সমস্যায় অধিক আক্রান্ত। ইহা উদ্বেগজনক এই কারণে যে, তাহারাই হইতেছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত্। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক সমস্যা তৈরির কারণ দারিদ্র্য, পরিবার ও বিদ্যালয়ে নির্যাতন, মাদকাসক্তি, পড়ালেখার অত্যধিক চাপ, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, প্রেম বা পরীক্ষায় ব্যর্থতা, বিষণ্নতা প্রভৃতি। তবে কিছু নূতন উপসর্গও শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যেমন— কম্পিউটার, ভিডিও বা স্মার্টফোন গেমস। এই গেমিংয়ের নেশাকে কয়েকটি দেশের প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছে খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাহারা প্রথমবারের মতো ইহাকে মানসিক রোগ হিসাবেও স্বীকৃতি দিতে যাইতেছেন। এই আন্তর্জাতিক সংস্থার ১১তম ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ (আইসিডি)তে ইহাকে গেমিং ডিজঅর্ডার হিসাবে উল্লেখ করা হইবে বলিয়া জানা যায়।

অতিরিক্ত মাত্রায় প্রযুক্তি নেশা শিশু-কিশোরদের মধ্যে যেভাবে মানসিক সমস্যা তৈরি করিতেছে তাহা বড় চিন্তার বিষয় বৈকি। শিশু-কিশোরদের সম্পর্কে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করা, উত্ত্যক্ত করা, সাইবার বুলিং ইত্যাদিও তাহাদের জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইতেছে। বলা হইতেছে ২০৩০ সালের মধ্যে ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ হইবে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ডিজিজ বা রোগ যাহা হইতে শিশু-কিশোররাও আশঙ্কামুক্ত নহে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ১৫ হইতে ২৯ বত্সর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। বিশ্বব্যাপী ইহাকে ‘ফাস্ট ইমার্জিং ডিজিজ’ হিসাবে দেখা হইতেছে। এই আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ মানসিক বৈকল্য। ইহার বড় ঝুঁকিতে রহিয়াছে বিশেষত মেয়ে শিশুরা। কেননা তাহারা বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, দাম্পত্য কলহ, প্রণয়ঘটিত সম্পর্কের জটিলতা, উত্ত্যক্তকরণ বা প্ররোচিতকরণ, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, লোকলজ্জার ভয় প্রভৃতির শিকার হন। বিশেষ করিয়া ১০ হইতে ১৯ বত্সরের মেয়েরাই এইক্ষেত্রে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।

আমাদের দেশে মানসিক সমস্যাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। মানসিক রোগ তো দূরের কথা, আমরা সাধারণত শারীরিক রোগ জটিল আকার ধারণ না করা পর্যন্ত সহজে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হই না। আবার মানসিক রোগ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ও নেতিবাচক ধারণাও বিদ্যমান। মানসিক রোগী মাত্রই পাগল নহে। অথচ মানুষের অত্যাচারের কারণে অনেক সময় মা-বাবা তাহার মানসিক বিকারগ্রস্ত ছেলে-মেয়েকে শিকলে বাঁধিয়া রাখিতে বা গৃহবন্দি করিয়া রাখিতে বাধ্য হন। এই অবহেলা ও অনাদরের কারণেও একসময় শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করে। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, যাহারা আত্মহত্যা করেন, তাহাদের ৯৫ ভাগই কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। তাই এই ব্যাপারে আমাদের এখন হইতেই সিরিয়াস হওয়া প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন উপযুক্ত চিকিত্সা। আগেভাগেই এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হইবে, দেরি করিয়া অনুশোচনায় ভুগিলে চলিবে না।

SHARE