‘ধন্য সেই পুরুষ’

19

আহা! তাহার সমস্ত দেহমন জুড়িয়া ছিল বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ। পলিমাটির মতো নরম আদুরে ছিল তাহার হূদয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময়ে তাহা রৌদ্রতপ্তে কঠিন হইয়া উঠিতে দ্বিধা করিত না। তিনি হইয়া উঠিয়াছেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞান, আমাদের মুক্তির ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ নেতা, আমাদের আত্মপরিচয়ের জনক। কী অপূর্ব তাহার উপহার—একটি স্বাধীন সার্বভৌম্য রাষ্ট্রের ‘পাসপোর্ট’। যৌবনের সবচাইতে উজ্জ্বল দিনগুলি তিনি উত্সর্গ করিয়াছিলেন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে, বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের দ্ব্যর্থহীন সংগ্রামে। তিনি আমাদের শিখাইয়াছেন—কীভাবে রুখিয়া দাঁড়াইতে হয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে; হিংসা, অবিচার, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে। তাহার গভীরতম উপলব্ধি আর সংগ্রামের প্রতিচ্ছাপ দেখিতে পাওয়া যায় তাহারই রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’য়। তাহাকে নবনব পাঠে আমরা নূতন করিয়া অনুধাবন করিতে পারি, কী পর্বতপ্রতিম প্রতিকূলতার স্রোত ঠেলিয়া একটি স্বাধীনতার দুর্লভ সূর্য ছিনাইয়া আনিয়াছেন তিনি! বলিয়াছেন—‘আমার ধারণা হয়েছিল মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্যে জীবন দিতেও পারে।’

মানুষের হূদয় উজার করিয়া ভালোবাসিবার মতো এমন মহান নেতা কি আর কখনো জন্মাইবে এই পলিবিধৌত অপূর্ব বদ্বীপে? যাহার দেহমন জুড়িয়া ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ, পলিমাটির মতো নরম আদুরে ছিল যাহার কোমল হূদয়—সেই মহান নেতার হূিপণ্ডখানি কিনা ছিন্নভিন্ন করা হয় অজস্র বুলেটের ছোবলে? ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’—তাহার মতো এমন গভীরতম উপলব্ধিতে আর কে ভালোবাসিতে পারিয়াছেন বাংলা-মাকে? সত্তরে যখন প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে মুখ ফিরাইয়া রাখিয়াছিল তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, তখন একাত্তরের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে তিনি বলিয়াছেন— ‘মহাপ্রলয়ে দক্ষিণ বাংলার ১০ লাখ লোক মারা গেল। লাখ লাখ লোক অসহায় অবস্থায় রইল। রিলিফ কাজের জন্য বিদেশ থেকে হেলিকপ্টার এসে কাজ করে গেল, অথচ ঢাকায় একখানা মাত্র সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর কোনো হেলিকপ্টার আসলো না। আমরা এসব বেইনসাফির অবসান করব।’ তিলে তিলে জমা হওয়া পাকিস্তানের পর্বতসম বেইনসাফির চূড়ান্ত জবাব তিনি দিয়াছিলেন মুক্তিসংগ্রামের ভিতর দিয়া। তাহার এমনই জাদুকরী শক্তি যে, চূড়ান্ত মুক্তির আন্দোলনকালে বাংলার দামাল ছেলেদের মনোজগতে তিনি একটি মুজিব হইতে পরিণত হইয়াছিলেন লক্ষ মুজিবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাত্রে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সপরিবারে হত্যার ভিতর দিয়া নূতন করিয়া যেই অন্ধকার সময়ের সূচনা ঘটানো হইয়াছিল—সেই অমা-রজনিকে দীর্ঘায়িত করা হইয়াছিল কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়া ঘাতকরা দম্ভের সহিত ভাবিয়াছিল, ইতিহাসের অদৃশ্য পাতা হইতেও মুছিয়া ফেলিতে পারিবে বঙ্গবন্ধুর অবদান। সেই চেষ্টা নিরন্তর চলিয়াছে ২১ বত্সর ধরিয়া। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের স্রোত ততদিনে ধানমণ্ডির ৩২ হইতে গড়াইয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছিল সমগ্র বদ্বীপ জুড়িয়া। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো সকল প্রতিবন্ধকতাকে তুচ্ছ করিয়া একটি সময় প্রবল শক্তিতে জাগিয়া উঠিল বঙ্গবন্ধুর অপরিমেয় কীর্তি।

খুনিরা হয়তো জানিত না—বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তিমাত্র নহেন, তিনি এই রূপসী বাংলার আদর্শ ও স্বপ্নের প্রতীক। কখনোই হত্যা করা যায় না এই আদর্শকে। বঙ্গবন্ধুর জন্যই বাংলাদেশ আজ একটি সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র। কবি শামসুর রাহমান ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতায় বলিয়াছেন—‘তোমার বুক ফুঁড়ে অহঙ্কারের মতো / ফুটে আছে রক্তজবা, আর / আমরা সেই পুষ্পের দিকে চেয়ে থাকি, আমাদের /চোখের পলক পড়তে চায় না।’

বঙ্গবন্ধু এমনই এক অপার বিস্ময় বাঙালি জাতির জন্য!

SHARE