চোরাই পথে গরু আসা বন্ধ হউক

174

বর্তমান সরকার পশু উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় গত কয়েক বৎসরে গবাদি পশু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়াছে। বাংলাদেশ এখন গরু-ছাগল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ পাঁচ বৎসর আগেও কোরবানির ঈদে বৈধ-অবৈধ পথে ভারত, নেপাল ও মিয়ানমার হইতে ২০-২৫ লক্ষ গরু আমদানি করিয়া চাহিদা মিটাইতে হইত। কিন্তু গত এক বৎসরেই কোরবানির পশুর উৎপাদন বাড়িয়াছে প্রায় তিন লক্ষ। প্রতিবেশী দেশ আমাদের দেশে গরু রপ্তানি বন্ধের পর আমাদের জন্য তাহা শাপে বর হইয়াছে। এখন বাংলাদেশে এমন গ্রাম খুঁজিয়া পাওয়া মুশকিল, যেখানে গরুর খামার গড়িয়া উঠে নাই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে প্রতিবৎসর ২৫ শতাংশ হারে গবাদি পশুর খামার বাড়িতেছে। বর্তমানে খামারের সংখ্যা ৫ লক্ষ ৭৭ হাজার ৪১৬টি। চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলায় গড়িয়া উঠিয়াছে খামার । এইসব খামারে তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও কাজ করিতেছে। ফলে গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া মিলাইয়া গবাদি পশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ১২তম। ইতিমধ্যে দেশ ধান, চাউল, শাকসবজি ও মৎস্য উৎপাদনেও সাফল্যের পরিচয় দিয়াছে। তাহার ধারাবাহিতকায় আমিষের গুরুত্বপূর্ণ উৎসমূল গবাদি পশু উৎপাদনে আমাদের এই সাফল্য খুবই আশাব্যঞ্জক।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে খামারিদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়া গত ১৬ জুলাই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ঈদুল আজহা পর্যন্ত সব ধরনের ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সভায় জানানো হয়, দেশে বর্তমানে কোরবানিযোগ্য গবাদি পশু রহিয়াছে প্রায় ১ কোটি ১৮ লক্ষ। তন্মধ্যে ৪৫ লক্ষ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লক্ষ ছাগল-ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশু। আর ঈদুল আজহায় ১ কোটি ১০ লক্ষ পশু কোরবানি হইতে পারে। এই হিসাবে কোরবানির পরও ৮ লক্ষ পশু উদ্বৃত্ত থাকিবার কথা। যখন আমরা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হইয়া উঠিতেছি, তখন দেশের বাহির হইতে যে পশু আনিবার প্রয়োজন নাই, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু গতকাল ইত্তেফাকের এক খবরে বলা হইয়াছে যে, কুড়িগ্রামের রৌমারী ও ভূরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়া অবৈধভাবে প্রতিবেশী দেশের গরু আসিতেছে দেদার। ব্রহ্মপুত্রসহ বিভিন্ন নদী দিয়াও আসিতেছে গরু। ইহাতে গরুর খামারিরা যারপরনাই হতাশ। বর্তমানে দেশে গোখাদ্যের দাম চড়া। ইহার সঙ্গে অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও অত্যধিক। ফলে বিদেশি গরুতে কোরবানির পশুর বাজার সয়লাব হইয়া গেলে তাহাতে দেশীয় গরু উৎপাদনকারী খামারিরা চরম বিপাকে পড়িবেন। তাহা ছাড়া বন্যাদুর্গত এলাকায় পশুখাদ্য সংকটের কারণে অনেকে তড়িঘড়ি করিয়া পশু বিক্রয় করিতেছে বলিয়া খামারিরা ক্ষতির শিকার হইতেছেন।

অবশ্য এবার ১ কোটি ১০ লক্ষ পশু কোরবানি হইতে পারে বলিয়া যে হিসাব দেওয়া হইয়াছে তাহা সঠিক নাও হইতে পারে। কেননা গত বৎসর কোরবানিতে দেশে পশু জবাই হইয়াছিল ১ কোটি ১৫ লক্ষ। সেই হিসাবে কিছুটা সংকট যদি তৈরি হয়, তাহা হইলে তাহা বৈধপথে আমদানির মাধ্যমেই পূরণ করিতে হইবে। ভোক্তারা কম দামে কোরবানির পশু কিনিয়া আত্মসন্তুষ্টি লাভ করিতে চান। আবার খামারিরা চান লাভের মুখ দেখিয়া এই ব্যবসায় আরো উন্নতি করিতে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করিয়া চলিতে হইবে। খামারিরা যাহাতে পরবর্তী সময়ে পশু উৎপাদনে নিরুৎসাহিত এবং লোকসানের কারণে ঋণখেলাপিতে পরিণত না হন, তাহাও দেখিতে হইবে। এইজন্য অবৈধ পথে প্রতিবেশী দেশ হইতে গরু আসা বন্ধে সীমান্তে অবশ্যই কড়াকড়ি আরোপ করিতে হইবে।

SHARE