যাত্রীদের ভোগান্তি: ট্রেনের চাপ বাসে টিকিটের ২৬ লাখ টাকা ফেরত

193

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা রাজশাহীতে ঘুরতে এসেছিলেন তিনবন্ধু সিফাত, সাইফুল ও শরৎ। তারা যে টাকা নিয়ে এসেছিলো তা দিয়ে কেনাকাটা ও ঘোরার পর শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় এর কারণে তারা আটকা পড়েছে। তারা জানান, লাইন দাঁড়িয়ে টিকেট ফেরত দিয়ে যে টাকা পেয়েছি তাতে কোন রকমে দুপুরের খাবার ব্যবস্থা হবে। এখন বাসা থেকে টাকা না পাঠালে খুলনা যাওয়া সম্ভব না। মেহেদী হাসান এসেছিলেন তার বাবা নিয়ে আশকোনার হজ্ব ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। এসে দেখেন বিকালে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেসের যাত্রা অনিশ্চিত। এখন কোন বাসেরও টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছে এই পরিবার। শেষমেষ তারা ট্রেনের অপেক্ষায় আছেন কখন লাইন ঠিক হবে আর কখনই বা যাত্রা শুরু হবে। মাইনুল হাসান ঢাকায় যাবেন চাকুরীর সাক্ষাৎকার দিতে। বাস ও ট্রেনের কোন টিকেট না পেয়ে লোকাল বাসে যাত্রা করেন। তবে তিনি জানেন না শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকার দেওয়া সম্ভব হবে কিনা। চারঘাট উপজেলায় তেলবাহী ট্রেনের আটটি বগি লাইনচ্যুতর ঘটনার সিডিউল বিপর্যয় হয়ে পড়েছে রাজশাহীর ট্রেনগুলোর। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা পর্যন্ত ৭হাজার যাত্রীর ২৬ লাখ টাকারও বেশী টিকিটের মূল্য ফেরত দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ট্রেনের এই সিডিউল বিপর্যয়ে যাত্রীর চাপ বেড়েছে বাসে। ট্রেনের যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে বাসেই রওয়ানা দিচ্ছেন গন্তব্যে। ভোর থেকে লক্ষ্য করা গেছে নগরীর শিরোইল ও ভদ্রা বাসস্ট্যান্ডে। এত যাত্রীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে কর্মরত শ্রমিকরা। রাজশাহীর রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান বুকিং কর্মকর্তা আবদুল মোমিন জানান, তেলবাহী ট্রেনের আটটি বগি লাইনচ্যুতর ঘটনার সারাদেশের সাথে রাজশাহীর রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। এরপর সব ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। ফলে বুধবার রাতের ঢাকাগামীসহ মোট ৮টি ট্রেনের টিকিটের মূল্য ফেরত দেওয়া হয়েছে। এসব ট্রেনের মধ্যে রয়েছে ধূমকেতু এক্সপ্রেস, তিতুমীর এক্সপ্রেস, সাগরদাঁড়ি, কপোতাক্ষ, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস, মধুমতি এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস, সিল্কসিটি ও টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীদের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক আবদুল করিম জানান, যেসব ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়েছে তাদের টিকিটের মূল্য ফেরত দেয়া হচ্ছে। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তারা ২৬ লাখ টাকারও বেশী ফেরত দিয়েছেন। তবে হাতে আর নগদ টাকা নেই। তাই বাধ্য হয়েই বিকেলে পদ্মা ট্রেনের টিকেট ফিরত দিতে পারছেন না। টাকাও ফেরত দেয়া হচ্ছে না। যাত্রীদের পরে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। তবে দেরিতে হলেও সেই ট্রেন চলবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এদিকে বিকল্প পন্থায় রাজশাহীর সাথে সারাদেশের যোগাযোগ চালু রেখেছে রেল কর্তৃপক্ষ। ঢাকা অভিমুখি সকল ট্রেন ঈশ্বরদী থেকে এবং অন্যন্যা ট্রেন নাটোরের থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। এতে পুরো পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। ট্রেনের যাত্রীরা বাসে উঠে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সেখানেও নেই কোন টিকেট। বেশী বাসের ব্যবস্থা করে দিতেও টিকেট দিতে হিমশিম খাচ্ছে বাস কর্তৃপক্ষ। একতা ট্রান্সপোর্ট রাজশাহীর আঞ্চলিক ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম সুমন জানায়, চারঘাটে তেলবাহী ট্রেনের লাইনচ্যুতর ঘটনার ট্রেন বন্ধ থাকায় বাড়তি চাপ পড়েছে বাসে। নিয়মিত ট্রিপের চেয়েও আতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও যাত্রীদের টিকেটও চাপ সামাল দেয়া যাচ্ছে না। রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন পরিচালিত চেকপোস্ট থেকে জানানো হয়, সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১৯টি লোকাল বাস ছেড়ে গেছে। সবগুলোই ভর্তি ছিলো। অন্যন্যা দিনের তুলনায় আজ লোকাল বাসের চাপ একটু বেশি বলে জানানো হয় চেকপোস্ট থেকে। তবে প্রথম শ্রেণীর সব বাস ফুল বুক নিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। উল্লেখ্য, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজশাহীর চারঘাট হলিদাগাছীর দিঘলকান্দি ঢালানের কাছে তেলবাহী ট্রেনের ৮টি বগি লাইনচ্যুত হয়। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তেলবাহী ওই ট্রেনটি খুলনা থেকে রাজশাহীর হরিয়ানের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ট্রেনটি ঈশ্বরদী হয়ে রাজশাহী অভিমুখে যাচ্ছিল। পথে হলিদাগাছিতে লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনটির মাঝখান থেকে বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। তাই পরে আটটি বগি রেখে সামনের অন্য বগিগুলো নিয়ে তেলবাহী ওই ট্রেনটি বুধবার রাতেই রাজশাহীর হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়। রাত পৌনে ১০টার দিকে রিলিফ ট্রেন সেখানে পৌঁছে। তবে বৃষ্টির কারণে উদ্ধার কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়। ঘটনার পর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুর রশিদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনা তদন্তে বিভাগীয় ট্রান্সপোর্ট অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে।

SHARE