অপেক্ষার পালা শেষ রাজশাহীর আম নামছে আজ

291

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর আম নামেই সেরা। এক নামেই যার খ্যাতি দেশজুড়ে। মধুর মতন মিষ্টি, আর টসে টসে রসে ভরা আম। হাতে নিয়ে খেতে গেলে নিস্তার নেই, কনুই ভিজিয়েই খেতে হবে। তাই বছরে একবার খেলেও এমন আমের স্বাদ সব সময়ই রসনাবিলাসীদের জিভে লেগে থাকে। কেবল দেশেই নয়, রাজশাহীর আম যায় বহির্বিশ্বেও। এজন্য বছরজুড়েই চলে অপেক্ষা। চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ। মধুমাস পড়তে এখনও কয়েকদিন বাকি। আম পেকে গেলো তো আর গাছে রাখা যায় না। তাই এবার জ্যৈষ্ঠের আগেই পরিপক্ব হয়ে গাছ থেকে ঝুড়িতে নামছে ‘রাজশাহীর আম’। দেশবাসীকে বিষমুক্ত ফল দিতে গেলো তিন বছর ধরে গাছ থেকে আম ভাঙার জন্য সময় বেঁধে দিচ্ছে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। কিন্তু তীব্র তপদাহে সময়ের আগে অনেক আম পেকে গাছেই নষ্ট হয়ে যায়। এর ওপর মারাত্মক ঝড়-ঝঞ্ঝা আর শিলাবৃষ্টির ধকল যাচ্ছে এবার রাজশাহীর আমের ওপর দিয়ে। প্রথম দিকে গাছে যখন মুকুল আসা শুরু হয় তখন তীব্র শীত ছিল। আবার শেষের দিকে গরমও পড়তে শুরু করেছিল। তাই কয়েক বছরের তুলনায় এবার গাছে সবচেয়ে বেশি মুকুল এসেছিল। কিন্তু দফায় দফায় কালবৈশাখী আর শিলাবৃষ্টিতে এবার রাজশাহীতে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।তাই এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয়ে আছেন আম আমচাষিরা। তবে কৃষিবিভাগ বলছে এখনও যা অবশিষ্ট আছে তা দিয়েই দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এখন তাপদাহ কাটলেই হয়। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মণিগ্রামের আমচাষি ও ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, সাধারণত মধুমাস জ্যৈষ্ঠ শুরুর পর রাজশাহীতে ধীরে ধীরে আম পাকতে শুরু করে। কোনো আম আগে পেকে যায় কোনোটা আবার পরে। তাই বিভিন্ন জাত ও নামের আম পর্যায়ক্রমে নামতে থাকে বাজারে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা মেনে নামানোয় গতবছর বাজারে প্রায় এক সঙ্গেই হাজির হয়েছিল সব জাতের আম। তবে অন্তত এবার তেমনটি হবে না। মধ্য রমজানের পর এক এক করে পর্যায়ক্রমেই বাজারে নামবে বিভিন্ন জাত ও স্বাদের আম। তবে রমজানের কারণে অনেকেই এখন আম ভাঙবেন না। সেই অর্থে বলতে গেলে ঈদের পরপরই পুরোদমে আম ভাঙা শুরু হবে রাজশাহীতে। অপর আমচাষি জসিম উদ্দিন বলেন, গাছে পরিপক্ব করে আম নামালে আর কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকাতে হয় না। এজন্য তার মতো সব চাষিই এখন গাছ থেকে পরিপক্ব আম নামান। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। এরই মধ্যে প্রায় গাছের আমেই পূর্ণতা এসে গেছে। বুধবার থেকে অনেকেই আগাম জাতের গুটি আম ভাঙতে শুরু করবেন। এরপর থেকে সব বাগানেই কিছু কিছু আম ভাঙা শুরু হবে। আর ঈদের পরপরই পুরোদমে ভাঙা শুরু করবেন আম। প্রথমেই জাত আম খ্যাত গোপালভোগ রাজশাহীর বাজারে আসবে বলেও জানান আমচাষি জসিম উদ্দিন। রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলিম উদ্দিন বলেন, গুটি আম প্রতিবছরই একটু আগে পাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই অনেকে এখন গুটি আম নামাতে শুরু করবেন। এছাড়া জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়ার সময় অনুযায়ী সাত দফায় আম নামাতে পারবেন। এতে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তাই আমের রাজধানী রাজশাহীতে এবার আম ভাঙা শুরু হচ্ছে আজ বুধবার। এই দিন থেকে শুরু হচ্ছে আম পাড়ার আনুষ্ঠানিকতা। এদিন থেকে পর্যায়ক্রমে সাত ধাপে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু পরিপক্ব আম গাছ থেকে পাড়া হবে। রাজশাহী জেলা প্রশাসেকর সম্মেলন কক্ষে গত রোববার দুপুরে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় আম পাড়া নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসএম আব্দুল কাদের। জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার সব ধরনের গুটি আম ১৫ মে, গোপালভোগ ২০ মে, রাণী পছন্দ ২৫ মে, খিরসাপাত ও হিমসাগর ২৮ মে, লক্ষ্মণভোগ ও লখনা ২৫ মে, ল্যাংড়া ৬ জুন, আমরুপালি ১৬ জুন, ফজলি ও সুরমা ফজলি ১৬ জুন এবং আশ্বিনা আম ১ জুলাই থেকে পাড়া যাবে। সভায় জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদের বলেন, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, গত বছর আম নামানোর তারিখ নির্ধারণ করে দেয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তারা নিশ্চিত ছিলেন যে, কোনো রাসায়নিক মিশিয়ে রাজশাহীর আম পাকানো হয়নি, এটা প্রাকৃতিকভাবেই পেকেছে। ফলে রাজশাহীর আমের সুনাম অক্ষুণ্ণ ছিল। এবারও থাকবে। তিনি বলেন, আম পাড়ার তারিখ নির্ধারণ করা না হলে বাগানে প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি করা হতো। কেউ যেন আগেভাগে অপরিপক্ব আম নামাতে না পারেন, সেজন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হতো। কিন্তু এত জনবলও আমাদের নেই। সব দিক বিবেচনায় আম নামানোর ক্ষেত্রে তারিখ নির্ধারণ করে দেয়া হল। তবে আগে পাকলে আম নামানোরও সুযোগ থাকল। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আবদুল আলীম, রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামসুল হক, রাজশাহী সাংবাদিক কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী, বাঘা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লায়েব উদ্দিন লাভলু, পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম হিরা বাচ্চু, বাঘার আমচাষি জিল্লুর রহমান প্রমুখ। তাপদাহ কেটে গেলে আর নতুন কোনো প্রকৃতিক দুর্যোগ না এলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো সমস্য হবে না বলেও মত দেন কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা।

SHARE