হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্যে অসহায় রোগি

181

স্টাফ রিপোর্টার : বুধবার বেলা ১১ টা রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগ। প্রধান গেট দিয়ে ডুকতেই মাইকে দালাল ও ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের প্রতি সতর্কতা জারি করছে রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। একই সময় বহির্বিভাগের ভেতরে ডুকেই পয়েন্টে পয়েন্টে দালালরা রোগি ও স্বজনদের ধরছে। এক রোগিকে হাত ধরে টেনে নিতেই আরো দালাল এসে হাজির। সকলের টানাটানিতে রোগির নাজেহাল অবস্থা। বিভিন্ন জেলা উপজেলা ও নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অসহায় রোগিদের নিয়ে এমন টানাটানি প্রতিদিনের দৃশ্য। দালালরা রোগি ও রোগির স্বজনদের বোঝাচ্ছে যে, মেডিকেলের ডাক্তাররা ভালোভাবে রোগি দেখেন না। বে-সরকারি হাসপাতালে অনেক ভালো চিকিৎসক রয়েছেন। সেখানে অল্প টাকায় সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয়।
অন্যদিকে রোগি ও স্বজনদের হাতে পরীক্ষার কাগজ দেখা মাত্রই একাধিক ধালাল টানাহেচড়া শুরু করে দেয়। এমন অবস্থায় শেষ পর্যায়ে দালালদের মাঝেই কাগজ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঘটছে গালিগালাজ ও হাতাহাতির ঘটনা। পাশেই পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিরব দর্শকের মত তা দেখছেন।
গত সপ্তায় চারদিন বহির্বিভাগে সরেজমিন উপস্থিত থেকে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। কর্তবরত কিছু অসাধু আনসার সদস্য রয়েছেন, যারা দাঁড়িয়ে থাকার ফাঁকে দালালদের কাছে থেকে টাকা উঠাচ্ছে। রামেক হাসপাতালে প্রতিনিয়ত এ ভাবেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি ও তাদের স্বজনরা। রাজশাহীর পুঠিয়া থেকে বাবাকে নিয়ে এসেছেন দুই মেয়ে হেলেনা ও তার ছোট বোন, রোজিনা বেগম নিয়ে এসেছেন তার স্বামীকে, জিয়া হোসেন নিয়ে এসেছেন ভাতিজাকেÑ তারা সকলেই দালালদের খপ্পড়ে পড়লেন। দালালরা ভুলিয়ে ভালিয়ে দুইজনকে নিয়ে যায় নগরীর আল্ট্রাপ্যাথ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ডাক্তার ভিজিটসহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে একজন সাড়ে তিন হাজার টাকা ও অন্যজন তিন হাজার টাকায় চিকিৎসা শেষ করেছেন। তবে এই চিকিৎসা হাসপাতালে করলে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় শেষ করা সম্ভব ছিল। অন্যদিকে বাবাকে নিয়ে এসেছেন রফিকুল ইসলাম। খুঁজছেন মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক। বিষয়টি বুঝতে পেরেই দুই দালাল এসে তাদের সামনে হাজির। জানালেন, ভাই মেডিকেলে কি চিকিৎসা দিবে! আপনার বাবার অবস্থা তো খুব খারাপ। এখানে লাইন ধরে চিকিৎসা নিয়ে কোনো লাভ নেই। আমাদের হাসপাতালে অনেক ভালো চিকিৎসক রয়েছে, অল্প টাকায় ভালো চিকিৎসা হবে। তাকেও এভাবে নিয়ে বাইরে চলে গেল দালালরা। বন্ধুকে সাথে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন, নাফি তালুকদার প্রিয়। তিনিও পড়লেন ধালালের খপ্পড়ে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কতিপয় চিকিৎসকের ছায়াতলে দালালরা নিয়মিত তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বহির্বিভাগের সামনেই চিকিৎসা শেষ করে পড়তে হচ্ছে আরেক ভোগান্তিতে। পুরো রাস্তায় ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য। তারা রোগি বা স্বজনকে ধরে ধরে তাদের প্রেসক্রিপশনের ছবি সংগ্রহ করছেন ফোনে। একজন শেষ ছবি তোলা শেষ করলে আরেক জন। এভাবে পদে পদে হয়রানির মধ্যে পড়তে হচ্ছে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি ও তাদের স্বজনদের। হাসপাতাল কর্তপক্ষের নির্দেশনা মতে প্রতি সপ্তাহে সোম ও বুধবার বেলা ১২ থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধিদের ভেতরে যাওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতিদিন সকাল থেকেই চলছে তাদের অবাধ বিচরণ। সকাল ১০ টার পরেই প্রতিনিয়ত চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছে তারা। মাঝে মাঝে রোগিদের লাইনে দাঁড় করে রেখে বিক্রয় প্রতিনিধিদের সাথে কথা শেষ করছেন অনেক চিকিৎসক। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ জানিয়েছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা। কিন্তু তারা অসহায়। তাদের কথা কেউ গ্রাহ্য করে না।
রোগি ও স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালের সর্বত্রই শুধু দালাল আর দালাল। চিকিৎসকের রুম থেকে বের হলেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র কেড়ে নিচ্ছে তারা। রোগিরা তাদের পছন্দ মত পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করতে চাইলে গালাগালি আর অপমান-অপদস্তু করছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই অনেকে দালালদের অনুসরণ করেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে রামেক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, ‘দালালদের বিষয়টি নতুন কোনো বিষয় নয়। এদের বিরুদ্ধে যখন অ্যাকশনে নামা হয় সে সময় অনেক প্রভাবশালী নেতাদের ফোন চলে আসে। তাই দালালদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিয়ে তেমন কোনো লাভ হয় না।
এ ব্যাপারে রামেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল জামিলুর রহমানকে ফোন দিলে তিনি জানালেন, এখন ব্যস্ত আছি পরে ফোন দেন- বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।

SHARE