রাজশাহীতে মহান মে দিবস পালিত

236

স্টাফ রিপোর্টার : ‘শ্রমিক মালিক ঐক্যগড়ি, উন্নয়নের শপথ করি’ এ প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বুধবার রাজশাহীতে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সকাল থেকেই মহানগরীতে বিভিন্ন শ্রমিক, পেশাজীবী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোভাযাত্রা, পথসভা, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।
দিবসটি উপলক্ষে নগরীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী ল্যাবরেটরি স্কুলের সামনে থেকে যৌথভাবে শোভাযাত্রা বের করে বিভাগীয় শ্রম দফতর, শিল্প সম্পর্ক শিক্ষায়াতন ও শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র। রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা আলমগীর কবির শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। শোভাযাত্রাটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটনের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মহান মে দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পন ও বর্ণাঢ্য র‌্যালি আয়োজন করে রাজশাহী মহানগর জাতীয় শ্রমিক লীগ। এসব কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন।

শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় কুমারপাড়াস্থ আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের পাশে স্বাধীনতা চত্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তর্বক অর্পন করেন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন। এরপর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে থেকে বিশাল বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। র‌্যালিতে মহানগর শ্রমিক লীগ, রেলওয়ে শ্রমিক লীগ, ডাক বিভাগ শ্রমিক লীগ, অটোরিকশা চালক সমিতিসহ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
কর্মসূচিতে অংশ নেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা, মহানগর শ্রমিক লীগের সভাপতি বদরুজ্জামান খায়ের, সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোহেল, সহ-সভাপতি এন্তাজ আলী, যুগ্ম সম্পাদক মেহেদী হাসান ও মোনোয়ার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিক এলাহী, প্রচার সম্পাদক আক্তার আলী, সহ-সাংগঠনিক রাশেদুজ্জামান রাশেদসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।
এছাড়া রাজশাহী মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি ও রাজশাহী শহর সংবাদপত্র শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শোভাযাত্রা বের করে। শেষে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সকাল ৮টার দিকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে বোর্ড চত্বর থেকে শোভাযাত্রা বের করা হয়।
এটি মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে আবারও শিক্ষা বোর্ড চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে শিক্ষা বোর্ড চত্বরে দিবসের ওপরে সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ মহান মে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি পৃথিবীর সব পেশার শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্ব এবং চরম দারিদ্র্য নিয়ে জীবনযাপন করার কথা উল্লেখ করেন।
এছাড়া সকাল ১০টায় মহানগরীতে শোভাযাত্রা করে খেলাঘর আসর, অনুশীলন পাঠাগার, সমগীত, মাদল, মুক্তপাঠ ও ম্যাজিক লণ্ঠনসহ বিভিন্ন সংগঠন। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে হাতে ছিল শ্রমিকদের নায্য দাবি আদায়ের বিভিন্ন রকম স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড। শোভাযাত্রাগুলো মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এছাড়া রাজশাহী ইমারত শ্রমিক ইউনিয়ন, বস্ত্র কর্মচারি ইউনিয়ন, জনতা ব্যাংক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং সিপিবি মহানগরীতে পৃথক শোভাযাত্রা বের করে। দিবসটি উপলক্ষে হোটেল-রেস্তোরাঁও বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া ব্যবাসায়ী প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ দোকানপাট বন্ধ থাকায় মহানগরী প্রায় ফাঁকা হয়ে পড়েছে। তবে রিকশাসহ হালকা যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
উল্লেখ্য,আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত। প্রতি বছর পয়লা মে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠনসমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পয়লা মে জাতীয় ছুটির দিন।
আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না-খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে ‘বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকর হয়।
দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবি জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়। কোনো কোনো স্থানে শিকাগোর হে মার্কেটের আত্মত্যাগী শ্রমিকদের স্মরণে আগুনও জ্বালানো হয়ে থাকে। পূর্বতন সোভিয়েত রাষ্ট্র, চিন, কিউবাসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মে দিবস একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সেসব দেশে এমনকি এ উপলক্ষ্যে সামরিক কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে। আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোক্তা। হে মার্কেটের হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যেকোনো আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।

SHARE