আজ মহান মে দিবস

160

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ১ মে, বুধবার মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে তখন থেকেই পৃথিবীর দেশে দেশে দিবসটি উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির জীবন মান ও মর্যাদার লড়াই এখনো চলছে। নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরো অবর্ণনীয়Ñ অমর্যাদায় বৈষম্যপূর্ণ। আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের নারী বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা গৃহস্থলি কর্মকাণ্ডে ও কৃষিশ্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদনের সাথে গ্রামীণ নারীর সম্পর্ক প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা উৎপাদন, জমিতে ব্যবহারের উপযোগী প্রাকৃতিক সার তৈরি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সব ক্ষেত্রেই এইসব নারীরা নিরলস ভূমিকা পালন করে থাকে। তারা তাদের হাজার বছরের লোকায়ত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। কৃষি কাজের সাথে জড়িত এইসব কিছুই শ্রমজীবী নারীরা নিজ হাতে করে থাকে। কিন্তু আজ কর্পোরেট বিশ্বায়নের যুগে এই নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নিজের ঘর সামলিয়ে বাইরে অন্যের ক্ষেত-খামার, রাস্তা-ঘাট, বাড়ি নির্মাণ কাজে শ্রম দিয়ে সংসারের আয়ে ভূমিকা রাখছে বরেন্দ্র অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক। সিকিউরিটি গার্ড। যাদের নেই কোন ধরনের ছুটি। ২৪ ঘণ্টা জানমালের নিরাপত্তায় কর্মক্ষেত্রে থাকতে হয় তাদের। তবে বেতন অনেক কম। অল্প বেতনে জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে রয়েছে তারা। এই কর্মীদের মানবেতর জীবনযাপন সঙ্গী হয়েছে। তবে সিকিউরিটি গার্ড কোম্পানিগুলো বলছে, চুক্তির উপরে নির্ভর করে কর্মীদের বেতন নির্ধারণ করা হয়। আর কর্মীরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে কোম্পানি বেশি টাকা নিয়ে তাদের অল্প দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন ব্যাংক, এটিএম বুথ, বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেন সিকিউরিটি গার্ডরা। রাজশাহীতে বেস্ট সিকিউরিটি ও এলিট ফোর্সসহ কয়েকটি কোম্পনি কাজ করছে। তারা নিজস্ব জনবল নিয়োগ দিয়ে কাজ করায়। এই কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে ৮ থেকে ১০ হাজার করে টাকা নেয়। কিন্তু সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা কেটে নিয়ে বেতন দেয় কর্মীদের (গার্ড)। রাজশাহীতে যমুনা নামের একটি এটিএম বুথে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করেন কয়েকজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেস্ট সিকিউরিটির এক গার্ড বলেন, তাদের ৫ হাজার ৯৪০ টাকা করে বেতন দেয়া হয়। এবিষয়ে বেস্ট সিকিউরিটির সুপারভাইজার মো. আনোয়ার বলেন, ‘এই কোম্পানির সিকিউরিটি গার্ডদের ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়।’ কর্মীদের বেতন কম দেওয়া হয় কেন এ বিষয়ে তিনি বলেন,‘ আমাদের অফিস ঢাকায়। আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে যে টাকা নেয় গার্ড প্রতি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয় কোম্পানির খরচ হিসেবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির পরেই নির্ধারণ করা হয় গার্ডদের বেতন। ’এছাড়া এলিট ফোর্স তাদের কর্মীদের ৫ হাজার ৭২০ টাকা বেতন দেয়। রাজশাহীতে শুধু সাউথ বাংলা ব্যাংকে কাজ করা সিকিউরিটি গার্ড ৭ হাজার ২০০ টাকা বেতন পান। এছাড়া বাকিগুলো ৬ হাজার টাকার কম বেতন পান। শুধু তাই নয়, কর্মীদের বেতন প্রদানের ক্ষেত্রে একটি নোট খাতায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয় সিকিউরিটি গার্ড কোম্পানিগুলো। দেখা গেছে, একজন কর্মীর বেতন ৫ হাজার ৭২০ টাকা হলে তার প্রতিদিনের উপার্জন ১০০ টাকার কম হচ্ছে। অল্প টাকায় কাজ নিয়ে অসহায়ত্বের কথা জানালেন কয়েকজন সিকিউরিটি গার্ড। তারা বলেন, ‘কাজের অভাব। সংসার পরিচালনার তাগিদের তাদের অল্প টাকায় কাজ করতে হচ্ছে।’ পারিশ্রমিক কম দিচ্ছে কোম্পানি আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ডরা বলেন, ‘এই চাকরির কোনো স্থায়িত্ব নেই। সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো তাদের ইচ্ছে মত কর্মী ছাটাই ও যোগদান করায়। আর মামলার বিষয় মানে দীর্ঘ সময়। কোথাও না কোথাও কাজ করতেই হবে। মামলা করেছি বেতনের দাবিতে জানাজানি হলে আর কেউ কাজ দেয়না।’ রাজশাহীতে শ্রম আদালতে শ্রমিকদের দাবি আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে মামলা হচ্ছে প্রতিদিনিই। আর প্রতিনিয়তই বাড়ছে মামলার সংখ্যাও। এই আদালতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নভিত্তিক মামলার সংখ্যাই বেশি। শ্রম আদালতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৯০টি মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। রাজশাহী শ্রম আদালতের রেজিস্ট্রার তুষার কান্তি রায় জানান, রাজশাহী শ্রম আদালতে ২০১৯ সালের জানুয়রি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪৫১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানি ১৫৭টি মধ্যে বিচারাধীন রয়েছে ১৪১টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১৬টি। অন্যদিকে, ফৌজদারি মামলা হয়েছে ২৯৪টির মধ্যে বিচারাধীন রয়েছে ২৪৩টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫১টি। এছাড়া ২০১৮ সালে রাজশাহী শ্রম আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলে ৫৪৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৩৫টি। শ্রমিকদের দাবি নিয়ে বছরের পর বছর নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও মুজরির বৈষম্য এখনো শেষ হয়নি। পারিশ্রমিকের বেলায় আজও নারীরা বিভিন্নক্ষেত্রে বৈষম্যের জাঁতাকলে প্রতিনিয়তই পৃষ্ট হচ্ছে। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই বৈষম্যের শিকার হন তারা। তবে অন্যান্য বৈষম্য কমলেও মজুরি বৈষম্য থেকে বের হওয়া যায়নি এখনো। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর ভদ্রা এলাকায় ড্রেনের ঢালাই কাজ করছেন আমেনা খাতুন (৫৪)। তিনি পবার শীতলাই এলাকা থেকে কাজে এসেছেন এই শহরে। তিনি প্রতিদিন পারিশ্রমিক পায় ৩০০ টাকা। কিন্তু একই কাজ করে ছেলেরা পাচ্ছে ৪০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘মালিকরা তাদের কম টাকা দেয়।’ কথা হয় শ্রমজীবী এক দম্পতি, সেলিম ও তাহসিনার সঙ্গে। তার দুইজনেই আমান নামের একটি জুট মিলে কাজ করেন। শ্রমে পারিশ্রমিক হিসেবে সেলিম ২৮০ টাকা পায়। আর তার স্ত্রী পায় তাহসিনা বেগম ১৮০ টাকা। তাহসিনা বেগম বলেন, ‘আমরা প্রায় এক বছর ধরে এই মিলে কাজ করছি। এখানে মেয়েদের বেতন একটু কম ছেলেদের তুলনায়। তারা মেয়েদের কম বেতন দিয়ে কাজ করায়। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের দিয়ে কর্তৃপক্ষ হালকা কাজগুলো করিয়ে নেয়। রাজশাহীর পবা, মোহনপুর ও তানোর উপজেলায় ১৫ হাজার ৪৫১ জন নারী ও ২ হাজার ২৩ জন পুরুষ শ্রমিকদের নিয়ে ওই জরিপ কার্যিটি পরিচালিত হয়। মঙ্গলবার পুরুষদের সাথে বরেন্দ্র অঞ্চলে সড়ক মেরামতের কাজ করছিলেন অনিমা রাণী, কাজলী হেমব্রম ও পারভীন বেগম। মজুরি বৈষম্য ছাড়াও নিজেদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার আকতারা বলেন, জীবিকার তাগিদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুরুষরা চলে যায়। এতে করে নারী শ্রমিকদের চাহিদা থাকে। তবে মৌসুম ভেদে কাজ করানো হয়। এজন্য আমাদেরকে মালিকরা একটু কম মুজরি প্রদান করে থাকেন। কিন্তু তাদের সমান আমরাও কাজ করি। উল্লেখ্য, মহান মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে। বিভিন্ন জেলায় মহান মে দিবস যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, জাতীয় শ্রমিক জোট, ঢ্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টি, সিপিবি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, জাসদ, গণফোরাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্ক, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন (ইনসাব), ঢাকা মহানগর প্রিন্টিং বাইন্ডিং শ্রমিক ইউনিয়ন ও পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন পৃথকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

SHARE