রাজশাহীতে রাতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন আম চাষীরা

156

গণধ্বনি ডেস্ক : রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছেন আদালত। এরপর তা কার্যকর করতে নজরদারি শুরু করে প্রশাসন। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, এবার বৈরী আবহাওয়ায় এমনিতেই আমের ফলন কম। তার ওপর এখন তীব্র গরমে বেড়েছে পোকামাকড়ের উপদ্রব। কীটনাশক বা বালাইনাশক না দিলে বাগানের অবশিষ্ট আমও নষ্ট হয়ে যাবে।

এতে দারুণ ক্ষতির মুখে পড়বেন চাষীরা। তাই প্রশসনের নজরদারি এড়িয়ে রাতে বাগানে বালাইনাশক ছিটাচ্ছেন তারা। চাষীরা বলছেন, এই বালাইনাশক আর আম পাকানোর ‘রাসায়নিক’ এক জিনিস নয়। তাদের দাবি, এ ব্যাপারে আদালতে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাও একইরকম মত দিয়েছেন।

জানা গেছে, ৯ এপ্রিল উচ্চ আদালত রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলোতে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধে নির্দেশনা দেন। এরপরই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন- নির্বাহী অফিসার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দুই জেলায় ১৫টি নজরদারি বা পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে। দুই জেলার আমচাষী ও বাগান মালিকদের নিয়ে একাধিক সভাও করা হয়। রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসনের দাবি, ১২ এপ্রিল থেকেই আমপ্রধান এলাকাগুলোতে নজরদারি চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো জেলায় আমবাগানে কীটনাশক ব্যবহারের অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি।

সোমবার সকালে রাজশাহীর পবার পারিলার কয়েকটি বড় আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, প্রশাসনের নজরদারির মাঝেও কিছু কিছু এলাকায় চাষিরা কীটনাশক ছড়াচ্ছেন আমগাছে। পারিলার হাটরামচন্দ্রপুর গ্রামের আম চাষী সাইফুল ইসলাম জানালেন, বাগানে মাঝে মাঝে ইউএনও সাহেব পুলিশ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। তারা চাষীদের বোঝাচ্ছেন। কীটনাশক না প্রয়োগ করতে বলছেন। কিন্তু ভরা এই মৌসুমে আম রক্ষায় তাদের সামনে আর কোনো বিকল্পও নেই।

রাজশাহীর খড়খড়ি এলাকার কয়েকজন আমচাষী জানান, প্রশাসনের লোকজন সকালের দিকে বাগানগুলো পর্যবেক্ষণে বের হন। তাই তারা প্রশাসনের নজর এড়াতে এখন রাতের বেলা গাছে স্প্রে করছেন। তারা আরও বলছেন, সারা বছরের কষ্টের ফসল এখন চোখের সামনে পোকায় খেয়ে ফেললে তারা পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকবেন।

রাজশাহীর বাঘার বাউশা এলাকার আমচাষী খবির উদ্দিন প্রামাণিক জানালেন, তারা কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়েই সরকার অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করেন।

রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের পুকুরিয়া, চতুরপুর, কানসাট, আব্বাস বাজার, কালুপুর, সদর উপজেলার মহারাজপুর, চকআলমপুর ও হরিনগর এলাকার কয়েকটি বড় আমবাগান ঘুরে দেখা গেছে, আদালতের নির্দেশনা ও প্রশাসনিক নজরদারির মধ্যেও অনেকে বাগানে বালাইনাশক ব্যবহার করছেন।

শিবগঞ্জের কালুপুরের আমচাষী সাকির হোসেন নিজ বাগানে  বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম নাবি জাতের বলে দেরিতে পাকে। ক্ষীরসাপাত, ন্যাংড়া, ফজলিসহ উন্নত জাতের আম পাকতে এখনও দেড় মাসের বেশি সময় বাকি। আম পুরোপুরি না পাকার আগ পর্যন্ত পোকামাকড়ের প্রাদুর্ভাব চলতেই থাকবে। আম যত পুষ্ট হচ্ছে, এক ধরনের কাটাপোকায় আমের ভেতর কেটে গর্ত করে ফেলছে। তাপমাত্রার হেরফেরে এই পোকার আক্রমণের তীব্রতাও বাড়ছে। ফলে বালাইনাশক ব্যবহার না করলে অবশিষ্ট আমও আর রক্ষা করা যাবে না।

কীটনাশকের ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনার বিষয়ে এই আমচাষী বলেন, আদালতের কাছে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। মিডিয়ায়ও আদালতের নির্দেশনাটি সঠিকভাবে আসেনি। তার আরও দাবি, আদালত বলছেন বাগানে কীটনাশক দেয়া যাবে না, তবে আম পাকার কতদিন আগে দেয়া যাবে না সে ব্যাপারে কিছু স্পষ্ট করা হয়নি।

শিবগঞ্জের চতুরপুর এলাকার চাষী আবদুর রাকিব ও কানসাটের শ্যামপুর এলাকার কাইয়ুম আলী নিজ নিজ আমবাগানে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, কীটনাশক দিয়ে আম পাকানো যায় না। আম বাঁচানো হয়। তবে এক ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে অপক্ব আমে হলুদ রঙ করা যায় যা দেখলে আম পাকা মনে হয়। আর সেটা করা হয় আড়তে- বাগানে নয়। প্রশাসনের উচিত এসব রাসায়নিক বা বিশেষ হরমোন বিক্রি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। এখন প্রশাসন যা করছে তাতে পোকার আক্রমণে বিপুল আম নষ্ট হবে এবং এতে চাষীরাই একতরফাভাবে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে।

হাইকোর্টের আইনজীবী ইসমাইল হোসেনও অবশ্য একই দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আমি আদালতের নির্দেশনাটি দেখেছি। আমার জানামতে, বাগানে বা গাছে আম থাকতে কখনও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে আম পাকানো হয় না। এটা আড়তে করা হয়। উল্টো বাগান নজরদারির কারণে চাষীরা আতঙ্কিত হয়েছেন। আদালতের কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপন না হওয়ায় এই বিপত্তির মধ্যে পড়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের কয়েক লাখ আমচাষী। বাগানে নজরদারি না করে আড়তে নজরদারি বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, আম রক্ষায় বালাইনাশক ব্যবহার আর ফরমালিন বা রাসায়নিক ছিটিয়ে আম পাকানো এক জিনিস নয়। আম সংগ্রহের দুই সপ্তাহ আগে বালাইনাশক ব্যবহার করলে তার ক্ষতিকর বা প্রতিকূল প্রভাব ১৫ দিন পর আর ক্রিয়াশীল থাকে না।

ড. শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের অন্যান্য এলাকায় নজরদারি না থাকায় অপক্ব ও অপুষ্ট আম পেড়ে রাসায়নিক ছিটিয়ে আম পাকানো হয় মৌসুম শুরুর আগেই। এসব আম ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে চালান করে রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে চালানো হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষীদের ওপর।

এদিকে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক দেব দুলাল ঢালী জানান, আদালতের নির্দেশের পর আমচাষীদের সচেতন করার চেষ্টা করছেন তারা। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগবালাই থেকে আম ফসলকে কীভাবে রক্ষা করা যায় সেই বিকল্প নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার মতে, রাজশাহীর তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি। ফলে বাগানগুলোতে পোকার আক্রমণ বাড়ছে। প্রশাসনের লোকজন বাগানে গেলেই চাষীরা হাতজোড় করে বলছেন, স্যার এই একটি বাগানই আমার সারা বছরের রুটি-রুজির ভরসা। আমগুলো আমাদের বাঁচাতে দিন। চাষীদের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে প্রশাসনও কিছুটা নমনীয় বলে জানান তিনি।

রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) আনোয়ার হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা যাতে কোথাও লঙ্ঘিত না হয় সে চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। তবে কোথাও যদি গোপনে কেউ আমবাগানে কীটনাশক স্প্রে করেন সে খবর প্রশাসনকে দেয়ার জন্য এলাকার মানুষকেও বলছি। আদালতের আদেশ যথাযথভাবে প্রতিপালনে প্রশাসন যথেষ্ট তৎপর বলে দাবি করেন তিনি। বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো ফাউন্ডেশনের চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার সদস্য সচিব আহসান হাবিব জানান, আমকেন্দ্রিক এই অঞ্চলের ১৫টি সংগঠনের নেতারা আম রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হস্তক্ষেপ চাইবেন।

SHARE