বনলতা এক্সপ্রেসের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

205

স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা রুটে একমাত্র বিরতিহীন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই নতুন ট্রেনটির উদ্বোধন করেন তিনি। এসমময় ভিডিও কনফারেন্সের অপরপ্রান্তে রাজশাহী রেলস্টেশনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন ও রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে উন্নয়ন-অগ্রগতির অন্তরায় এবং একটি বৈশ্বিক সমস্যা আখ্যয়িত করে এর বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে কোথায় সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদি কর্মকান্ডের সঙ্গে লিপ্ত সেটা শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই নয়, আমাদের দেশবাসীকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং এদের খুঁজে বের করে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে।’ ‘কারণ, আমরা দেশে শান্তি চাই। শান্তিই দিতে পারে উন্নতি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হলেই দেশ এগিয়ে যাবে,’ যোগ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি’র নাতি ছোট্ট শিশু জায়ান চৌধুরীর কলম্বোয় বোমা হামলায় মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েকদিন আগে ২১ তারিখে শ্রীলংকায় যে ঘটনা ঘটলো তাতে আমরা বাংলাদেশের কয়েকজনকে হারিয়েছি। সব থেকে দুর্ভাগ্য অনেকগুলো শিশু সেখানে মারা যায়। যেখানে আমাদের বাংলাদেশের শিশু জায়ানকে হারাতে হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এই ধরনের ঘটনা ঘটানোর অনেক চেষ্টা চলছে। তবে, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে যাচ্ছে।
এসময় ১৫ আগস্টের কালরাতের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় বিদেশে থাকায় আমরা দু’বোন প্রাণে বেঁচে গেলেও সেদিন বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউ বাঁচেনি। শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মেয়ের প্রথম সন্তান এই জায়ান। তাঁকে এভাবে আজকে জীবন দিতে হলো। আমরা চাই না এ ধরনের কোন শিশুর মৃত্যু।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যেহেতু ৮ বছরের শিশু জায়ান চৌধুরীকে আমরা হারিয়েছি। আমি জানি না যারা এ ধরনের হত্যাকান্ড চালায় তারা কি পায়, কি লাভ তাদের হয়? মানুষের ঘৃণা এবং অভিশাপ ছাড়া আর কিছু তারা পায় না।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা ইসলাম ধর্মের নাম নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ চালায় তারা এই পবিত্র ধর্মকে কলুষিত করছে। বিশ্বব্যাপী এই পবিত্র ধর্মের বদনাম করছে। তারা আসলে ইসলাম ধর্মের প্রচন্ড ক্ষতি করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘যে ধর্ম সবথেকে মানবতার ধর্ম, সবথেকে শান্তির ধর্ম- সেই ধর্মের নামে তারা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে। কাজেই এ ধরনের কাজে যারা সম্পৃক্ত-তাদেরকে বিরত থাকতে হবে।’
‘সে কারণে আমি সব অভিভাবক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, বাংলাদেশের জনগণ এবং মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন বা ধর্মীয় শিক্ষাগুরু এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী যারা প্রত্যেককে আমি বলবো, যার যার আওতায় যে সমস্ত শিশু, কিশোর, যুবক-যারা রয়েছেন বা ছাত্ররা যারা রয়েছেন বা শিক্ষকরা রয়েছেন বা সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এ ধরনের একটা প্রবণতা দেখা দেয় সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে সবাইকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি, ’বলেন প্রধানমন্ত্রী।
গত রোববার শ্রীলঙ্কায় গির্জা, অভিজাত হোটেল ও কলম্বোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। হামলায় এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এসময় গণভবন প্রান্তের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে রেল পথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জ্বল হোসেন নতুন চালুকৃত বনলতা এক্সপ্রেসসহ সমগ্র রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতির উপর একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন।
রাজশাহী রেলষ্টেশন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এবং রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী হুইসেল বাজিয়ে এবং সবুজ পতাকা উড়িয়ে ট্রেনটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন।
রাজশাহীর অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মনসুর রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শাহীন আকতার রেনী, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর-রহমান, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) একেএম হাফিজ আক্তার, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. হুমায়ুন কবির, রাজশাহী পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহিদুল্লাহ, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খোন্দকার শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ডা. আনিকা ফারিহা জামান অর্নাসহ উধ্বর্তন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। এছাড়া গণভবনের সঙ্গে রাজশাহীর ভিডিও কনফারেন্স পরিচালনা করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে জুম্মার খুৎবায় সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তরুণ এবং যুব সমাজকে এ সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের প্রতি আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী শুক্রবার দিন প্রতিটি মসজিদে শ্রীলংকার এই বোমা হামলা এবং জায়ান চৌধুরীর নিহত হওয়ার ঘটনায় এবং এর আগে নিউজিল্যান্ডের দু’টি মসজিদে গুলি চালিয়ে মুসলমানদের হত্যার ঘটনায় আপনারা দোয়া কামনা করবেন।
তিনি বলেন, ইমাম-মুয়াজ্জিন যারা আছেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, আপনারা দয়া করে জঙ্গিবাদ যে ইসলাম ধর্মের জন্য ক্ষতিকারক তা জনগণকে বোঝাবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে আমাদের নবী করিম (সা:) সবসময় শান্তির কথা বলে গেছেন, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও শেষ বিচারের দায়িত্ব কিন্তু মানুষকে দেন নাই। সেটি আল্লাহর হাতে। আমরা যারা কোরআন শরিফ পড়ি, যেখানে বার বার প্রায় প্রতিটি সুরাতেই আমরা তা পাই যে, বিচার করবেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তাহলে এই ধর্মের নামে মানুষ খুন করা কেন? যারা বিপথে চলে গেছে এর থেকে তারা যেন বিরত হয়।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সারাদেশে প্রত্যেক মসজিদে জুম্মার নামাজের খুৎবায় জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এবং ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সে কথাটা ভালভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৫শ’ জায়গায় একই দিনে বোমা হামলা থেকে শুরু করে গ্রেনেড হামলা, মানুষ খুন করা, আমাদের নেতা-কর্মীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার-নির্যাতন, জেল, জুলুম, অত্যাচার ছাড়া আর কিছু তারা করেনি।
তিনি বলেন, ঐ রাজশাহী বিভাগটাই সেই বাংলাভাই এবং জঙ্গিবাদের আখড়া ছিল এবং সব থেকে দুর্ভাগ্য তখনকার বিএনপি-জামায়াত সরকার এদেরকে মদদ দিতো। প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে নিয়ে তারা পুলিশের পাহাড়ায় মিছিল করতো।
তিনি বলেন, এই দেশকে তারা সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের দেশে পরিণত করেছিল। যার প্রভাব এখনও আমরা দেখি।
তিনি এ সময় বিএনপি-জামায়াতের অন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যারও কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা দেখেছি অগ্নিসন্ত্রাস, এই বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়েছে। আমরা রেলের নতুন নতুন বগি কিনেছি আর তারা সেগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। বিআরটিসি বাস কিনেছি সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া প্রাইভেট গাড়ি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ এমন কিছু নেই যা তারা অগ্নি সন্ত্রাসের কবলে ধ্বংস না হয়েছে।
সে সময় সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বামীর চোখের সামনে স্ত্রী, স্ত্রীর চোখের সামনে সন্তান ও স্বামী, বাবা-মায়ের চোখের সামনে সন্তান এমনকি সন্তানের চোখের সামনে মা-বাবাকে পুড়ে যেতে তাঁরা দেখেছে। কিন্তু আমরা চাইনা এ ধরনের ঘটনা আর বাংলাদেশে ঘটুক।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর সরকার দেশের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দেশে একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন এবং সেদিকে লক্ষ্য রেখেই তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান।
তিনি বলেন, ‘স্বল্প খরচে আরাম দায়ক ভ্রমন একমাত্র রেলই দিতে পারে।’ বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে রেল সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে দেওয়ার পথেই বিএনপি যাচ্ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অথচ প্রায় ৫৪ হাজারের কিছু বেশি বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের মানুষের দ্রুত যোগাযোগের জন্য রেল একটি অবিকল্প মাধ্যম।
তাঁর সরকার ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর এই জনপদে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং নতুন নতুন রেল সংযোগ এবং রেলপথ গড়ে তুলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতে রেল সংযোগের ব্যবস্থা করেছিলেন। আর বিশ্ব ব্যাংক এখন যমুনা নদীর ওপর পৃথক একটি রেল সেতু নির্মাণেরও প্রস্তাব দিয়েছে।’
‘এতদিন পড়ে তারা বুঝলো এটার প্রয়োজন যে কতবেশি এবং এটা কত যে লাভজনক,’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘দেশটা আমাদের কাজেই আমরা যতটা দেশের ভাল বুঝবো বাইরে থেকে হঠাৎ কেউ এসে সেটা বুঝবে না। এটাই হলো বাস্তবতা।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বেলা পৌনে ১২টায় ১২টি অত্যাধুনিক বগি নিয়ে বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ রাজশাহী স্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে। নতুন এ ট্রেনে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন যাত্রী হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। এছাড়া উদ্বোধনী দিনে যাত্রীরা বিনা টিকিটে রাজশাহী থেকে ঢাকা যাওয়ার সুযোগ পান। ট্রেনটি চালুর আগে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ফুল দিয়ে যাত্রীদের বরণ করে নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নে রাজশাহী কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, কেন জানি এলাকাটার উন্নতি হয়নি। সেই জন্য আমরা রাজশাহীর দিকে আলাদাভাবে দৃষ্টি দিচ্ছি। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করছি। রাজশাহীর জন্য আমরা পদ্মা নদী ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। রেল, নৌ এবং আকাশপথের যোগাযোগেরও উন্নয়ন দরকার। আমরা রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশালের বন্ধ বিমানবন্দর চালু করেছি। তিনি বলেন, এখন রেলপথ যেন প্রতিটি বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে সেই পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তাহলে পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোতে সহজে কাঁচামাল নিয়ে যাওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য পাঠানো যাবে। নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামনে ঈদ আর জ্যেষ্ঠ মাসের পাকা আম- দুটোই মাথায় রেখে আমরা বনলতা এক্সপ্রেস চালু করলাম। আশা করি, রাজশাহী থেকে আম আসবে। আর ঈদ করতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরবে। তিনি বলেন, ট্রেনে অল্প খরচে আরামদায়ক ভ্রমণ করা যায়। এটি নিশ্চিত করতে আমরা রেলপথকে আলাদা মন্ত্রণালয় করেছি। কেননা, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যখন রেল যুক্ত ছিল তখন বাজেটের টাকা ভাগ করার সময় রেল খুবই অল্প পেত। আমরা উন্নয়ন করে যাচ্ছি। উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীই এই ট্রেনের নাম রাখেন ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। উদ্বোধনের প্রথম দিন যাত্রীরা বিনাটিকিটেই এই ট্রেনে যাত্রা করেন। বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে রাজশাহীবাসীর আরেকটি প্রাণের দাবি পূরণ হলো। ঢাকা-রাজশাহী যোগাযোগে যোগ হলো এক নতুন মাত্রা। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, যে দেশ যত উন্নত সে দেশের রেল তত উন্নত। বিরতিহীন ট্রেন চালুর ব্যাপারে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যে দাবি ছিল সেটি আজ পূর্ণ হলো। আশা করছি, রাস্তার ওপর নির্ভরতা, যানজট ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থেকে মানুষ মুক্ত হবে। তিনি বলেন, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম আমরা রেলের মাধ্যমে গোটা দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। সেই পরিকল্পনা নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ঢাকা-রাজশাহী রুটে চলাচলকারী একটি ট্রেন যেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত যায় সেই পরিকল্পনাও আমরা ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছি। এ জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রেনের পরিস্কার করার ব্যবস্থা করছি। একটু সময় লাগবে। কিন্তু অচিরেই আমরা এটি করতে পারব।
রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, বিরতিহীন ট্রেন চালু, এটি যে কত বড় ভাগ্য! কত বড় পাওয়া তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। ট্রেনটি চালু করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে অত্যাধুনিক বগি আমদানি করা হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। প্রতিটি বগির দাম পড়েছে সাড়ে চার কোটি টাকা। বনলতার ১২টি বগিতে প্রতিদিন ২ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। রেলপথ বিভাগ থেকেই এই ট্রেনে ভ্রমণকারীদের জন্য নিশ্চিত করা হবে খাবার। ট্রেনটি থেকে বছরে সরকারের আয় হবে ৩৭ কোটি টাকা। বনলতায় দেশের একমাত্র ট্রেন যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। ট্রেনটিতে সংযুক্ত রয়েছে উড়োজাহাজের মতো বায়োটয়লেট। এ কারণে মলমূত্র রেললাইনের ওপরে পড়বে না। রয়েছে রিক্লেনার চেয়ার ও স্লাইডিং ডোর। আছে ওয়াইফাই সুবিধা। প্রতিটি বগিতে রয়েছে এলইডি ডিসপ্লে, যার মাধ্যমে স্টেশন ও ভ্রমণের তথ্য প্রদর্শন করা হবে। রয়েছে ওজুখানা ও নামাজের স্থান। এছাড়াও রয়েছে প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন। কিন্ত নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো ধরনের শ্লিপিং বার্থ। ট্রেনটি শুধু দিনের বেলায় চলাচল করবে, তাই এর দরকার পড়ছে না আপাতত। ট্রেনের একটি খাওয়ার বগি ও পাওয়ার কার বগি বাদেই মোট আসন সংখ্যা ৯২৭টি। বিরতিহীন চার্জ ধরে এই ট্রেনে ভ্রমণের জন্য অন্য ট্রেনের তুলনায় যাত্রীদের ১০ শতাংশ বেশি ভাড়া গুণতে হবে। সাধারণ শোভন চেয়ারের ভাড়া পড়বে ৩৭৪ টাকা। আর এসি চেয়ারের ভাড়া লাগবে ৭২২ টাকা। বনলতা ঢাকা-রাজশাহীর ৩৪৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে চার ঘণ্টা ৪০ মিনিটে। অন্য ট্রেনের তুলনায় সময় বাঁচবে প্রায় দুই ঘণ্টা। ঘন্টায় ট্রেনটির সর্ব্বোচ্চ গতিবেগ উঠবে ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার। আগামী ২৭ এপ্রিল থেকে সপ্তাহের শুক্রবার বাদ দিয়ে বাকি ছয়দিন ট্রেনটি ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা রুটে চলাচল করবে। সকাল ৭টায় ট্রেনটি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে পৌঁছাবে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে। আর ঢাকা থেকে দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬টায়। বগিগুলো নতুন হলেও ২০১৩ সালে ভারত থেকে আমদানি করা দুটি ভালোমানের ইঞ্জিন দিয়ে চলাচল করবে ট্রেনটি। রাজশাহী-ঢাকা রুটে এতোদিন আন্তঃনগর ট্রেন পদ্মা এক্সপ্রেস, ধূমকেতু ও সিল্কসিটি এক্সপ্রেস চলাচল করত। বনলতা এক্সপ্রেস চালুর ফলে এই রুটে এখন আন্ত:নগর ট্রেনের সংখ্যা হলো চারটি।
পশ্চিমাঞ্চল রেল সূত্র জানায়, বনলতায় রয়েছ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা ১২টি নতুন বগি। এর মধ্যে শোভন চেয়ারের সাতটি বগিতে আসন ৬৪৪টি। দুটি এসি বগিতে আসন সংখ্যা ১৬০টি। এ ছাড়া দুটি খাবার গাড়িতে ৫৪টি করে ১০৮টি আসনসহ ট্রেনটিতে মোট ৯২৮টি আসন রয়েছে। উন্নতমানের খাবার এবং ওয়াইফাই সুবিধা থাকবে প্রতিটি বগিতে।
৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাল ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের পর বৃহস্পতিবার ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে রাজশাহী থেকে ঢাকায় পৌঁছায়। বিরতিহীনভাবেই ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছেছে। ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও ছিল। ট্রেনের এক যাত্রী ঢাকায় পৌঁছার পর সাংবাদিকদের মোবাইল ফোনে বলেন, তাঁরা ৪ ঘণ্টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছেছেন। ট্রেনের ভেতরে তাঁদের আপেল, প্যাটিস ও পানি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

SHARE