পাবনায় ৫৯৫ চরমপন্থীর আত্মসমর্পণ

265

পাবনা প্রতিনিধি : ‘সন্ত্রাসী পথ ছাড়ি, স্বাভাবিক জীবন গড়ি’- এই শ্লোগানে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রত্যাশায় দেশের ১৪টি জেলার চারটি নিষিদ্ধ সংগঠনের ৫৯৫ চরমপন্থি সদস্য ৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপির কাছে আত্মসমর্পন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনউদ্দিন স্টেডিয়ামে চরমপন্থীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। দেশের ১৪টি জেলার পূর্ববাংলার সর্বহারা, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা), নিউ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ও কাদামাটির নামের ৪টি চরমপন্থী সংগঠনের ৫৯৫ জন চরমপন্থী সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তারা ৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৭৫টি দেশীয় অস্ত্র জমা দেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ভুল বুঝে যারা উগ্রবাদ চরমপন্থী সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন, তারা নিজেদের ভুল উপলব্ধি করতে পেরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে আত্মসমর্পণ করছেন। জলদস্যু, মাদক কারবারী ও চরমপন্থীরা সবাই একে একে আত্মসমর্পণ করছেন। আমাদের পুলিশ গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে ১০ বছর আগের বাহিনীর তুলনা করা চলবে না। তিনি বলেন, কারণ বাংলাদেশের আইনশৃংখলা বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে পার পাওয়া যাবে না। যে সব চরমপন্থী সদস্য আত্মসমর্পণ করলেন তারা যেন স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। আত্মসমর্পণকারীদের আইনি সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করবে সরকার। মন্ত্রী আরো বলেন, বিগত ১৯৯৯ সালেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২ হাজার চরমপন্থী সদস্য আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, যারা এখনো আত্মসমর্পণ করেন নি। যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা আত্মসমর্পণ করলে তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, পাবনার এই অনুষ্ঠানে যে সকল চরমপন্থী আত্মসমর্পণ করলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত। তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধান আলোচকের বক্তৃতায় বাংলাদেশ পুলিশের আইজি ড. জাবেদ পাটোয়ারি (বিপিএম, বার) বলেন, উগ্রপন্থা ও চরমপন্থা দমনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে রোল মডেল। আজ যেসব চরমপন্থি আত্মসমর্পন করছেন, তাদের আইনী প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা হবে। যাতে তারা মূল স্রোতধারায় ফিরে আসতে পারে। আইজিপি বলেন, ২০ বছর পরে আবার আজকের এই আত্মসমর্পণ। জঙ্গি ও মাদক ব্যবসায়ী অনেকেই পুলিশের সহযোগিতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, পুলিশের অনেক সদস্য উগ্র জঙ্গিদের হাতে প্রাণ দিলেও তারা জঙ্গিবাদ দমন করতে সক্ষম হয়েছেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে নওগাঁ জেলার পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা) প্রধান আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আর্ট বাবু তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় চারুমজুমদারের আদর্শে সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গড়া সম্ভব ভেবেই চরমপন্থী সংগঠনে যোগ দেই। কিন্তু দলের আদর্শ, কথা ও কাজের মিল না থাকায় অন্ধকার জগতে পড়ে যাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সারা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছি। ভাবতে ভালো লাগছে। যারা এখনো আসেনি তাদেরকে বলি ফিরে আসুন। পাবনা জেলার পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা) প্রধান ইকবাল শেখের স্ত্রী রত্না খাতুন প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, তার স্বামী এ সংগঠন করায় পরিবার পরিজন নিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ছেলে মেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারিনি। অন্ধকার জীবনের চেয়ে শান্তির পথ অনেক ভালো। তিনি তাদের জন্য সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন, পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাভোকেট শামসুল হক টুকু, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, পাবনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মকবুল হোসেন, পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবীর, রাজশাহী-৪ আসরে সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নাদিরা ইয়াছমিন জলি, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন, আরএমপি কমিশনার এ.কে.এম হাফিজ আক্তার বিপিএম (বার) ও পাবনার জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন। যে সব জেলা থেকে চরমপন্থীরা আত্মসমর্পণ করেন, সেসব জেলার মধ্যে পাবনায় ১৩২ জন, ফরিদপুরে ২৭ জন, রাজবাড়ীতে ৩৪, সিরাজগঞ্জে ৬৯, নাটোরে ২৭, নওগাঁয় ৭০, বগুড়ায় ১৫, টাঙ্গাইলে ৩১, রাজশাহীতে ৬০, খুলনায় ৩৫, নড়াইলে ০২, যশোরে ০২, সাতক্ষীরায় ০৬ ও জয়পুরহাটে ৮২ জন। আত্নসমর্পনকারীদের মধ্যে রয়েছেন ১৬ জন দলনেতা। এরা হলেন- লালপতাকার ফরিদপুর- রাজবাড়ীর আনোয়ার হোসাইন খান, পাবনার মোবারক হোসেন, মো. আব্দুল আলিম, বাবলু বেপারী, রাজশাহী বিভাগের ইকবাল শেখ, আবু তালেব শেখ, আব্দুর রাজ্জাক ওরফে আর্ট বাবু, বগুড়ার মো. মহসিন আলী ও মো. মহসিন মল্লিক; পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির পাবনার মো. ইউসুফ আলী ফকির ওরফে মিন্টু ফকির, পাবনা-সিরাজগঞ্জের মো. মনসুর আলী ও রাজশাহীর আতাউর রহমান; নিউ পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির খুলনার ফারুক হোসেন মোল্লা ও লিপু মোল্লা, সাতক্ষীরার আবদুল্লাহ আল মামুন; এবং কাদামাটি দলের জয়পুরহাটের রমজান আলী সরদার (কাদামাটি)। এদিকে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান সফল করতে এক সপ্তাহ ধরে পাবনা শহরের মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিলবোর্ড স্থাপনসহ জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয়। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অনুষ্ঠানকে সফল করাসহ ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। পাবনা শহরের এবং আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের আশপাশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। প্রসঙ্গত ২০ বছর আগে ১৯৯৯ সালে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ২ হাজার চরমপন্থী নেতাকর্মী সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের উদ্যোগে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

SHARE