নগরীতে আন্দোলনে একাট্রা সংস্কৃতি কর্মীরা ‘উপহার’ বন্ধ হচ্ছে!

200

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মহানগরীর একমাত্র ও সর্বশেষ সিনেমা হল ‘উপহার’। ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিনোদনপ্রেমী মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এ হলে আসতেন সিনেমা দেখতে। সিনেমাপ্রেমীদের এই প্রেক্ষাগৃহ আর থাকছে না। ১২ অক্টোবর থেকে এটিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হলটিতে বর্তমানে প্রদর্শিত হচ্ছে শাকিব খান, নুসরাত ফারিয়া, সায়ন্তিকা অভিনীত ‘নাকাব’ সিনেমা। ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে সিনেমাটি। এ সিনেমা প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই শেষ হচ্ছে মহানগরীর নিউমার্কেট সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ উপহারের পথচলা। এদিকে, নগরীর একমাত্র সিনেমা হল ‘উপহার’ বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং এটিকে রক্ষায় নগরীতে আন্দোলন শুরু করেছেন সংস্কৃতি কর্মীরা। রাজশাহী চলচ্চিত্র সংসদসমূহ ও স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা একাট্রা হয়ে এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
‘উপহার’ বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং এটিকে রক্ষায় গত রোববার নগরীতে মানববন্ধন করেছেন রাজশাহী চলচ্চিত্র সংসদসমূহ ও স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সদস্যরা। একই দাবিতে গতকাল সোমবার ‘উপহার’ সিনেমা হলটির সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্যে উপমহাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, জীবন নিয়ে বাঁচা কোন বাঁচা নয়, সংস্কৃতির মধ্যে বাঁচাটাই প্রকৃত বাঁচা। রাজশাহীতে সংস্কৃতির সুবাতাস বইছে, পাল উড়াইয়া দাও। রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার উদ্যোগে এখানকার সংস্কৃতি চর্চা এগিয়ে যাবে।
এ কর্মসূচিতে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আমরা সংস্কৃতিকে বাণিজ্যিক ভাবে দেখবো না, ঐতিহ্যের সাথে মিলিয়ে দেখবো। চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে রাজশাহীতে একাধিক সিনেমা হল থাকবে। রাজশাহী এসোসিয়েশনের উচিত অলোকা সিনেমা হল তৈরি করা। চলচ্চিত্র শিল্প রক্ষায় সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় প্রতিটি জেলায় ১টি করে ডিজিটাল সিনেমা হল করতে পারে।
এসময় আরো বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ রুহুল আমিন প্রামানিক, ডা: এফএমএ জাহিদ, রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আব্দুল মোমিন, রাজশাহী থিয়েটারের সভাপতি নিতাই কুমার সরকার, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ড. সাজ্জাদ বকুল প্রমুখ। রাজশাহী চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি আহসান কবির লিটনের সঞ্চালনায় এসময় ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটিসহ স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এতে অংশ নেয়।
সিনেমা-সংশ্নিষ্টদের মতে, মন্দা ব্যবসার কারণেই সিনেমা হল একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের মধ্যে অপ্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে ভালোমানের সিনেমা তৈরিতে চাপ বোধ করছেন না কেউ। ফলে দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে এ শিল্প।
১৯৯১ সালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় প্রেক্ষাগৃহ ছিল ৫৫টি। তবে সরেজমিনে জেলায় ওই সময় ২৫টি প্রেক্ষাগৃহের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে জেলায় বর্তমানে উপহারসহ চালু আছে মাত্র ছয়টি সিনেমা হল।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, একসময় বিনোদনের মূল মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। রাজশাহীতে কোনো সিনেপ্লেক্সও গড়ে ওঠেনি। এটা বন্ধ হলে সমাজের একটি বড় অংশ বিনোদনবঞ্চিত হবে। এখন সারাবিশ্বেই পরিশীলিত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত সিনেমা তৈরি হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণ করে সিনেমা হলটি চালু রাখার একটি সম্মিলিত প্রয়াস নেওয়া যেতে পারে।
নগরীর জনপ্রিয় সিনেমা হলগুলোর মধ্যে স্মৃতি, উৎসব, বর্ণালী, লিলি ও উপহার সিনেমা হলের নামে এখনও এলাকার মোড়গুলোর নামকরণ রয়ে গেছে। নেই শুধু সিনেমা হলগুলোই। একে একে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শহরের একমাত্র উপহার সিনেমা হলটিতে সারাবছরই দর্শক সমাগম হতো।
নগরীতে প্রেক্ষাগৃহ ছিল ছয়টি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অলকা- পরবর্তী নাম স্মৃতি, কল্পনা- পরবর্তী নাম উৎসব, স্নিগ্ধা- পরবর্তী নাম উপহার, বর্ণালী, লিলি এবং কাটাখালীর নতুন পরবর্তী নাম রাজতিলক। এগুলোর মধ্যে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রেক্ষাগৃহটি ছিল রাজশাহীর বর্ণালী সিনেমা হল। এর আসন ছিল এক হাজার ৩৭৩টি।
২০০৭ সালে শহরের সবচেয়ে পুরনো প্রেক্ষাগৃহ স্মৃতি সিনেমা হল ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহীর ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাবের উদ্যোগে নাট্য আন্দোলন এগিয়ে নিতে নির্মিত হয়েছিল ‘রাজা প্রমথনাথ টাউন হল’। প্রতিষ্ঠা থেকে সেখানে নিয়মিত বাংলা সাহিত্য ও নাট্যচর্চা হতো। ১৯১৯ সালের ২ এপ্রিল ভিক্টোরিয়া ক্লাবের কাছ থেকে হলটি কিনে নেয় রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। পরে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে অলকা সিনেমা হল যাত্রা শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে স্মৃতি সিনেমা হল নামে হলটির নামকরণ হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক আফরাউজ্জমান খান চৌধুরী ওরফে বাবুল ও তার ছোট ভাই আব্দেল নাসের চৌধুরী ওরফে রুবেল হলটি চালাতেন। পরে ওই হল ভেঙে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। নগরীর আলুপট্টির উৎসব সিনেমা হলে ২০১০ সালের জুলাইয়েও চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। পরে তা ভেঙে স্বচ্ছ টাওয়ার নামে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়। নগরীর কাদিরগঞ্জ ও আমবাগানের মধ্যবর্তী এলাকায় ছিল বর্ণালী সিনেমা হল। বর্তমানে হলটি না থাকলেও শহরের ওই এলাকার নামকরণ রয়েছে বর্ণালীর মোড় নামেই। শহরের পাশেই মোল্লাপাড়ার লিলি সিনেমা হলটিও আর নেই।
বর্তমানে জেলার দুর্গাপুরে নার্গিস, নওহাটায় বাবুল, তানোরে আনন্দ, কেশরহাটে দিনান্ত, বাগমারায় শাপলা সিনেমা হল রয়েছে। ঈদ বা পূজা উপলক্ষে মাঝেমধ্যে এসব হলে সিনেমা চালানো হয়। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই তা বন্ধ থাকে।
উপহার সিনেমা হলটির সিট মিস্ত্রি সোহাগ আলী জানান, মালিকপক্ষ থেকে জানিয়েছে, ১২ অক্টোবর থেকে হলটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। হলটি বন্ধ হলে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তারা বেকারত্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়বেন।
উপহার সিনেমা হলের দারোয়ান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হলটি যখন প্রথম চালু হয়, তখন থেকেই এখানে কাজ করছি। হঠাৎ শুনতে পাই, হলটি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন থেকেই চিন্তায় আছি। কারণ, অন্য কোনো কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই এবং ব্যবসা করার মতোও অর্থ নেই।
উপহার সিনেমা হলের ম্যানেজার তাপস কুমার বলেন, আগামী ১২ তারিখ থেকে হলটি বন্ধ থাকবে। হলটি কি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে, নাকি সাময়িক বন্ধ থাকবে- এ বিষয়ে কিছু জানি না। মালিকপক্ষ থেকে শুধু বলা হয়েছে হল বন্ধ রাখার জন্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, হলের ব্যবসা ভালো হচ্ছে না বলে- মালিক সাজিদ হোসেন চৌধুরী জমিসহ ১০ কোটি টাকায় হলটি বিক্রি করে দিয়েছেন। নতুন মালিক এখানে আর সিনেমা হল রাখবেন না। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য হলটির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নগরীর বর্ণালী হলের সর্বশেষ মালিক সারোয়ার মোর্শেদ জানান, মন্দা ব্যবসার কারণেই বর্তমানে সিনেমা হল চালু রাখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অপ্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণেই দেশের সিনেমার মান নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে দর্শক আগ্রহ হারায়। আমরা দাবি করেছিলাম, বছরে অন্তত ১২টি বিদেশি সিনেমা চালু রাখতে। তাহলে প্রতিযোগিতার চাপে হলেও ভালো সিনেমা তৈরিতে আগ্রহ বাড়ত দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। হলগুলোতে দর্শক থাকত। তা না হওয়ায় হলগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
চলচ্চিত্র পরিচালক ওয়াজেদ আলী সুমন বলেন, এভাবে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য পরিবার বেকার হয়ে যাবে। তা ছাড়া হল না থাকলে ফিল্ম চলবে কোথায়? চলচ্চিত্র শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকদের এখনই সোচ্চার হওয়া উচিত। সিনেমা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে গবেষণাও করা উচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি ড. সাজ্জাদ বকুল বলেন, বিভাগীয় একটি শহরে একটি সিনেমা হল থাকবে না, এটা একটি অশনিসংকেত। রাজশাহীকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলার জন্য নতুন করে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই ভেতরে এ উপহার সিনেমা হলকে সংস্কার করে একটি আধুনিক মানের হল হিসেবে গড়ে তোলা এবং হলটি ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ডা. এফ এম এ জাহিদ বলেন, এভাবে সব সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হলে নতুন প্রজন্ম সিনেমা হল আর কখনও চিনবে না; পরিচয়ও ঘটবে না। তাই ঐতিহ্য হিসেবে হলেও বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে একটি সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য সমাজের দায়িত্ববান কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করছি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, ছোটবেলায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই মর্নিং শো ইংলিশ মুভি দেখতে হলগুলোতে দল বেঁধে বন্ধুরা যেতাম। এখন সেই পরিবেশ আর নেই। তারপরও বলব, শহরের ঐতিহ্য হিসেবে যেন সর্বশেষ সিনেমা হলটি সংরক্ষণ করা হয়।

SHARE