প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা

552

স্টাফ রিপোর্টার :রাজশাহী নগর ছেড়ে গ্রাম। সবখানেই যায় কার্তিক পালের হাতে তৈরি চোখ জুড়ানো প্রতিমা। বৈশাখ মাস পড়তে না পড়তেই মণ্ডপের উদ্যোক্তারা বায়নার টাকা হাতে নিয়ে ছুটে আসেন কার্তিকের বাড়ি। দরদাম মিটমাট হলে কাজে ডুবে যান কার্তিক পাল। তার সঙ্গে আরও ৬ জন কর্মী। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হয় দুর্গতিনাশিনী দেবীর এক একটি প্রতিমা।

এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি এলাকায় কার্তিক পালের বাড়িতে বেশ জোরেশোরেই চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নরম কাদা-মাটি দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিল তিল করে গড়ে তোলা হচ্ছে দশভুজা দেবী দুর্গার প্রতিমা। আর মাত্র ক’দিন পরেই দেবীর বোধন। তাই পালবাড়ির চারিদিকেই এখন ব্যস্ততার ছাপ। কাঠের কাঠামোয় দাঁড় করানো কাদার মূর্তিগুলোতে রঙ করে ‘জীবন্ত’ করে তোলার কাজ চলছে এখন।

রাজশাহী শহরের বেশিরভাগ এলাকার পূজা মণ্ডপই সাজে পাল বাড়ির এই প্রতিমায়। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেন এখানকার প্রতিমা শিল্পীরা। হাতের নিপুণ কারিগরিতে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০টি প্রতিমা গড়ে তোলা হয়। প্রতিমার সাজ-সজ্জা শেষে তুলে দেওয়া হয় বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে। তবে নানা কারণে এবার প্রতিমার সংখ্যা একটু কম। এবার শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে ২৪টি প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এখানকার মৃৎশিল্পীরা।

প্রতিমা শিল্পী কার্তিক চন্দ্র পাল জানালেন, তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ি। সেখানেই বংশ পরম্পরায় এ পেশা পেয়েছেন। বাবা বাবু চন্দ্র পাল তার শৈল্পিক হাতে প্রতিমা তৈরি করতেন। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে এগুলো দেখেই তার বেড়ে ওঠা। প্রতিমা তৈরির নেশা তাকে বইপত্রে মন বসাতে দেয়নি। তাই মাত্র দশ বছর বয়সেই দীক্ষা নেন বাবার কাছে।

বাবার কাছেই শেখেন কাদা-মাটি আর কাঠ-খড় দিয়ে কিভাবে প্রতিমা গড়তে হয়। তারপর গোবিন্দ পাল আর অমল পাল নামের দুই ওস্তাদের কাছেও প্রতিমা তৈরির দীক্ষা নেন। কাজ শিখে গেলে চলে আসেন রাজশাহী। কার্তিক শুনেছিলেন, এখানে প্রতিমা শিল্পীদের ভালো কদর। কার্তিক বলেছেন, রাজশাহী এসে দেখেছেন- তার শোনা সে কথাটি সত্য। প্রতিমা তৈরি করে বেশ ভালোই চলে তার সংসার।

কার্তিক জানান, গেলো ২৭ বছর থেকে তিনি প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। তার কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিমার ক্যাটালগ আছে। তা দেখেই দুর্গাপূজা শুরুর অনেক আগে প্রতিমা তৈরির অর্ডার দিয়ে যান রাজশাহীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপের উদ্যোক্তারা। এভাবে অন্য পূজার ক্ষেত্রেও অর্ডার নিয়ে পুরো বছরই প্রতিমা তৈরির কাজ থাকে। তবে দুর্গাপূজা উপলক্ষে চার মাস তাদের রাতদিন এক করে কাজ করতে হয়। কেননা, নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরেই তাকে প্রতিমা সরবরাহ করতে হয়।

কার্তিক পাল বলেন, প্রতিমা তৈরির জন্য চারঘাটের সারদা থেকে মাটি কিনতে হয়। তবে মাটির চেয়ে পরিবহনের খরচই বেশি। এক ট্রাক মাটির দাম আট থেকে নয় হাজার টাকা। কিন্তু তা আনতে গাড়ি ভাড়া লাগে আট থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা। এছাড়া প্রতিমা সাজানো চুল বর্তমানে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি। এর সঙ্গে রঙ, শাড়িসহ অন্যান্য সাজ-সজ্জার উপকরণ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিটি প্রতিমায় খরচ হয় প্রায় ২০ হাজার টাকায়। সর্বনিম্ন ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে তিনি প্রতিমা বিক্রি করেন। তবে এর ভেতর থেকে আবার কর্মীদের পারিশ্রমিক দিতে হয়। ৬ জন কর্মীর একটি প্রতিমা তৈরি করতে গড়ে ৬ দিন সময় লাগে।

কার্তিকের বাড়িতে ৬ জন প্রতিমাশিল্পী কাজ করছেন। তাদের একজন রাজকুমার পাল। তিনি জানান, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাজ শেষ করাই সবার লক্ষ্য। আষাঢ়ের নয় তারিখ থেকে তারা প্রতিমা তৈরি শুরু করেছেন। প্রতিমার কাঠামো গড়ার কাজ শেষ হয়েছে। এখন প্রতিমাগুলোয় রঙ লাগিয়ে পোশাক পরিচ্ছদে সুসজ্জিত করা হবে। তারপর আগামী ১৩ অক্টোবর থেকেই বিভিন্ন মণ্ডপে পাঠানো হবে।

রাজশাহী হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি অনিল কুমার সরকার জানান, আগামী ১৪ অক্টোবর দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে ছয় দিনব্যাপী এই শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হবে। ১৫ অক্টোবর আমন্ত্রণ ও অধীবাস, ১৬ অক্টোবর দেবীর সপ্তমীবিহিত, ১৭ অক্টোবর দেবীর মহাঅষ্টমীবিহিত, কুমারী পূজা, সন্ধি পূজা, ১৮ অক্টোবর দেবীর নবমীবিহিত এবং ১৯ অক্টোবর মহাদশমীতে বিহিত পূজা, সমাপন ও দর্পন বিসর্জন এবং সন্ধ্যা আরত্রিকের পর প্রতিমা বির্সজনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব শেষ হবে। এই উৎসব পালনে তারা প্রতিক্ষার প্রহর গুণছেন।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, পুরো রাজশাহীতে এবার ৪৫৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে রাজশাহী মহানগরের ভেতরে মণ্ডপের সংখ্যা ৮০টি। উৎসবে নিরাত্তার বিষয় নিয়ে তারা জেলা ও মহানগর পুলিশের সঙ্গে আলাদাভাবে সভা করেছেন। জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও তারা সভা হয়েছে। প্রশাসন তাদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করছেন। রাজশাহীতে শান্তিপূর্ণভাবে এ উৎসব হবে বলেই আশা প্রকাশ করেন তিনি।

SHARE