শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা

186

স্টাফ রিপোর্টার : শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় উত্তাল হয়ে উঠেছে পদ্মাপাড়ের রাজশাহী। হাতে মাত্র আর দু’টি দিন। তাই একটি মুহূর্তও যেনো নষ্ট করতে চাচ্ছেন না প্রার্থীরা। পাখি ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গড়িয়েছে প্রচারণা। কনকনে শীত উপেক্ষা করেই চলছে গণসংযোগ, মাইকিং ও মিছিল-মিটিং। দিন শেষে পরের দিনের পরিকল্পনায় নির্ঘুম রাত কাটছে প্রার্থী, কর্মী ও সমর্থকদের। তাই বিভিন্ন আশঙ্কার মধ্যেও রাজশাহীতে ভোটের আমেজ যেন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। বাজছে ভোটের ঢোল। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যেও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় প্রার্থী ও সমর্থকরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। প্রতিশ্রুতির খই ফোটাচ্ছেন। তাই নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা জমজমাট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ করলেও প্রচারে পিছিয়ে নেই বিএনপির ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ, এলাকায় এলাকায় প্রচার মিছিল, সমাবেশে প্রতিশ্রুতি আর উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরা হচ্ছে। মাইকের গান ও নানান ¯ে¬াগানে নির্বাচনীর আমেজ দেখা দিয়েছে রাজশাহীর প্রতিটি এলাকায়। ১৪ দল মনোনীত ও মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা গত ১০ বছরের উন্নয়ন তুলে ধরে ভোট চাচ্ছেন। মিজানুর রহমানও তাঁর সময়ের উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ মহাজোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা তাদের পোস্টার ব্যানার ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলছে। এর বাইরে এখন পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এ আসনটিতে। এছাড়াও সম্প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী বাদশা ও ধানের শীষের মিনুকে কোলাকুলি ও সৌহার্য বিনিময়ও করতে দেখা গেছে। ফলে বলা যায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমূখর পরিবেশে সদর আসনটিতে চলছে ভোট উৎসব।
ছয় আসনের মধ্যে ভোটের আমেজটা বেশি রাজশাহী-২ সদর আসনে। আসনটিতে ১৪ দল মনোনীত ও মহাজোট সমর্থিত প্রার্থী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা । আর বিএনপি প্রার্থী রাজশাহীর তিনবারের মেয়র এবং দু’বারের এমপি মিজানুর রহমান মিনু। বিএনপির কিছু অভিযোগ সত্ত্বেও এখানে প্রচারণা জমে উঠেছে। ভোটারদের কাছে গিয়ে সবাই ভোট চেয়ে কাকুতি-মিনতি করছেন। শোনাচ্ছেন উন্নয়নের কথা। ফজলে হোসেন বাদশা গণসংযোগে গিয়ে ভোটারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন তার গত দুই মেয়াদের উন্নয়নের কথা। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন অতীতে তার করা উন্নয়নের সব কথা। সেসঙ্গে নতুন করে দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। গতকাল বুধবার সকালে নগরীর তিন নম্বর ওয়ার্ডের ডিঙ্গাডোবা এলাকায় গণসংযোগের শুরুতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। রাজশাহী সদরের টানা দুইবারের এই সংসদ সদস্য বলেন, রাজশাহীতে আমার জন্ম। আমি এখানে বড় হয়েছি, রাজনীতি শিখেছি। রাজশাহীর মানুষ আমাকে কাছে রেখেছেন এবং রাখবেন। তারা বিপুল ভোটে আমাকে আবারও নির্বাচিত করবেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাদশা বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটা দুর্নীতির অভিযোগ তুলুক না। লোকে হাসবে। ১০ বছরে একটা দুর্নীতি করেছি, এমন নজির দেখাতে পারবে না। এটা রাজশাহীর মানুষ জানেন। আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে তো থানায় ১৭টা মামলা। খুনের মামলা, চুরির মামলা, চাঁদাবাজির মামলা, জঙ্গিবাদের মামলা, কী অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে! সবই আছে। নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে বিএনপি প্রার্থী মিথ্যাচার করছেন উল্লেখ করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, রাজশাহীতে বিএনপির জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। নৌকার জনমত দেখে তারা বুঝে গেছে ধানের শীষের ঘাঁটি ভেঙে গেছে। এটা বাস্তবতা। তাই তারা মিথ্যাচার করছে। আমরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচন শেষ করতে চাই। বিএনপি-জামায়াত সহিংসতার চেষ্টা করলে জনগণ তাদের প্রতিহত করবে। ফজলে হোসেন বাদশা এ দিন ডিঙ্গাডোবা মোড় ও নিমতলা বাজারসহ আশপাশের পাড়া-মহল্লায় নৌকা প্রতীকের প্রচারণা চালান। তিনি স্থানীয় মহল্লাবাসী ও ব্যবসায়ীদের হাতে হাতে নৌকা প্রতীকের লিফলেট তুলে দেন। আগামী ৩০ ডিসেম্বর নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান। তার সঙ্গে বিশাল এক মিছিল নিয়ে প্রচারণায় যোগ দেন ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ। ‘নৌকা’ ‘নৌকা’ শ্লোগান তুলে তারা চারপাশ মুখর করে তোলেন। প্রচারণায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নগর ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদকম-লীর সদস্য আবু সাঈদ, সদস্য সিরাজুর রহমান খান, রাজপাড়া থানা সম্পাদক আবদুল মতিন, ছয় নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নুরুজ্জামান টুকু, তিন নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহাতাব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক এসএম আরিফ রতন, ওয়ার্ড ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শাহ্আলম, রাজশাহী পশ্চিমাঞ্চল মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল আজিজ, মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হক টুকু, মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী, দিগন্ত প্রসারি সংঘের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক, ৩নং ওয়ার্ড যুগ্ম সম্পাদক মোকলেছুর রহমান রাজু, বহরামপুর মহল্লা কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আতাবুর রহমান প্রমুখ। এ সময় তার সঙ্গে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে প্রচারণায় নেমে রাজশাহী সদর আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বলছেন, তিনি বলছেন, রাজশাহীতে যত উন্নয়ন হয়েছে, বিএনপির আমলে হয়েছে। তিনি মেয়র ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্বে থাকার সময়ই বিশ্বের দরবারে রাজশাহী শান্তির শহর হিসেবে পরিচিতি পায়। তিনি রাজশাহী মহানগরকে গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি, হেলদি সিটি ও এডুকেশন সিটি হিসেবে গড়ে তোলেন। এমন কোনো স্থাপনা নেই যে তিনি করেননি। এই মহানগরের থেমে যাওয়া উন্নয়নের ধারা পুনরায় চালু করতে হবে।
পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্যও এই নির্বাচনে জয় লাভ করা জরুরি বলে তিনি ভোটারদের কাছে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করছেন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মিনু রাজশাহীর আরডিএ মাকের্টে গণসংযোগ করেন। বেকারত্ব সমস্যা দূর করতে রাজশাহীতে শিল্পাঞ্চল (ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন) গড়ে তোলার কথা। এটি হলে প্রচুর বিনিয়োগ আসবে। কর্মস্থানের দিকে থেকে রাজশাহী আর পিছিয়ে থাকবে না।
রাজশাহীর ছয়টি আসনে এবার মোট ২৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ছয়টি আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১৯ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছে ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭১০ জন এবং নারী ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৮৫২ জন। এর আগে গত নির্বাচনে রাজশাহীতে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৭ জন। এবার নতুন ভোটার হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৯০৫ জন। এজন্য নারী ভোটারদেরই এবার জয়ের নিয়ামক শক্তি বলা হচ্ছে।

SHARE