অসহায়দের ঠিকানা আশ্রয়ণ প্রকল্পে

24

স্টাফ রিপোর্টার: দোচালা ঘর, সাজানো সংসার, চাষের জমি- সবই ছিল। পদ্মা নদী সব কিছু গ্রাস করে নিয়েছে। সর্বস্বান্ত হয়েছে পুরো পরিবার। এমনকি মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত ছিল না। এখানে-সেখানে, অন্যের জমিতে, সরকারি খাস জমিতে খুপড়ি ঘর করে থেকেছি অনেক দিন। বারবার উচ্ছেদ হয়েছি। আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেছি। এভাবেই জীবনের সঙ্গে লড়াই-সংগ্রাম করে চলেছি ২৫-৩০ বছর। শেখের বেটি জমি দিচ্ছে, ঘর দিচ্ছে শুনে আবেদন করেছিলাম। এখন শেখ হাসিনার দেওয়া ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো ভাষা নেই মুখে!’

এভাবেই এক আবেগাপ্লুত স্বরে কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব চার সন্তানের জননী বিজলা বেগম। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাওয়ার অভিব্যক্তি জানতে চাইলে এসব কথা বলেন তিনি। কথা বলার শুরু যে দীর্ঘশ্বাস আর জীবন যুদ্ধের ক্লান্তি উচ্চারণে, তার সমাপ্তি ঘটে হাসি আর তৃপ্তির ছোঁয়ায়। এটি যেন পুরো মুজিববর্ষের আশ্রয়ণ প্রকল্পে বদলে যাওয়া সব জীবনের কথাই বলছে।

কেবল বিজলা বেগমই নন, তার মতো আরও অনেকে প্রায় একই ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন। সবাই রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ৬ নম্বর মাটিকাটা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের লালখা পুকুর মোলাইনের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। এখানে মুজিববর্ষের একক ঘর পেয়েছে ৫৫টি আশ্রয়হীন ও গৃহহীন পরিবার। উপকারভোগী এসব পরিবার পদ্মা ও মহানন্দা নদীর ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকার মানুষ ছিলেন। এখন তাদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২ শতাংশ করে জমি এবং একটি করে ঘর।

জানা যায়, ১৯৫৪ সাল থেকে এই ভূখণ্ডে বন্যার দাপট বেড়ে যায়। এরপর ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে বড় ধরনের বন্যা হয়, যার মধ্যে ১৭টি ছিল প্রলয়ঙ্করী। এসব বন্যায় সর্বগ্রাসী পদ্মা ও মহানন্দার তীরবর্তী বিস্তির্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। এসব জায়গার সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলো একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, পরিবার নিয়ে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার জন্য নানান স্থানে পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে কিছু পরিবার ৮০ ও ৯০ এর দশকে চলে আসেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গোদাগাড়ীর মাটিকাটা ইউনিয়নের লালখা পুকুরের চারপাশে সরকারি খাস জমিতে আশ্রয় গাড়েন এসব পরিবার। এই পরিবারগুলো কাঁচা ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। এগুলো ছিল মূলত বাঁশ, বেত, খড় ও টিনের তৈরি, যা ছিল একেবারেই জরাজীর্ণ। কিছু ঘর ছিল মাটির তৈরি, যার ওপরের অংশে ছিল খড়ের ছাউনি। বর্ষার মৌসুম ও শীকালে এই পরিবারগুলোর দুর্ভোগ সীমা ছাড়িয়ে যেতো।

অতীতের সেই সীমাহীন দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে চোখের পানিতে গাল ভাসান সামেদা বেগম, যার বয়স এখন ৬৫ বছর। তিনি বলছিলেন, ‘পদ্মা নদীর নাম শোননি বাবা? ওই পদ্মা নদী আমাদের সবকিছু কেড়েছে। সব হারিয়ে পথে পসেছিলাম আমরা। মাথার ওপর ছাদ নাই, পেটে খাওন নাই। এখানে এসে আশ্রয় নেই। ছোট্ট একটি খুপড়ি ঘর বানাই। সেখানেই পুরো পরিবার থাকি। প্রতি বছর মানষের কাছ থেকে খড়-কুটো এনে ছাউনি দিতাম। বৃষ্টির সময় অইলে এখান দিয়ে, ওখান দিয়ে পানি পড়তো। শীতের সময় ঠান্ডায় ঘরেও মধ্যেও টেকা যাইত না। রাস্তা-ঘাট ছিল না। সেই কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না।’

উত্তরের হিমেল হাওয়ায় এখনও কাঁপছে রাজশাহীর মানুষ। কোনো দিন সূর্যের দেখা মেলে, কোনোদিন একেবারেই মেলে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিই যেখানে ঠান্ডায় কুপকাত, সেখানে এই অসচ্ছল পরিবারের সদস্যদের দুরবস্থা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে প্রতিটি পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ত্রাণ তহবিলের টাকায় কেনা দুইটি করে কম্বল পাওয়ায় কিছুটা হলেও সস্তি পেয়েছে।

যেখানে হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না, সেখানে এখন রিকশা-ভ্যান নিয়ে যাতাযাত করার মতো নতুন রাস্‌তাও করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠলো রোজিনা বেগমের (৩৮) কথায়। স্বামীহারা এই নারীর আশ্রয় এখন বাবার ঘরে, যিনি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর পেয়েছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগে কোথায় থাকবো, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া মায়ের ঘরে থাকছি। নতুন এই ঠিকানায় এসে একটি সেলাই মেশিন পেয়েছি। কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। আমার কোনও সন্তান নেই, বোনের বাচ্চাকে মানুষ করছি। সব মিলিয়ে এখন সুখেই আছি।

লালখা পুকুর সোলাইন-এর আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে বড় আকারের একটি পুকুরের চারপাশে। এখানে প্রতিটি পরিবারকে দুই শতক জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে তারা পেয়েছেন আধা পাকা একটি করে ঘর। ঘরের পাশের জমিতে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি শাক-সবজি চাষ করছেন তারা। কেউ সাবলম্বী হতে পালন-পালন করছেন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল। বিশেষ করে পরিবারগুলোর নারী সদস্যরা গৃহস্থলির কাজের পাশাপাশি এসব কাজ করছেন। এতে পরিবারের আমিষ ও পুষ্টিকর খাবারের চাহিদা পূরণ ছাড়াও বাড়তি আয় হচ্ছে।

সীমা আক্তার নামে ২৮ বছরের এক নারী বলছিলেন, শেখের বেটির দেওয়া এই আশ্রয়ণের জমি ও ঘরই এখন আমাদের আপন ঠিকানা। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘরের তিন পাশে যে টুকু জমি পেয়েছি, তাতে শাক-সবজি লাগিয়েছি। দুইটা গরু, একটা ছাগল পালছি। এখন আর থাকার কষ্ট করতে হয় না। শাক-সবজি আর গরুর দুধ খেতে পারছে বাচ্চারা। আমার মতো অন্যেরাও হাঁস-মুরগি-গরু-ছাগল পালছে। আমাদের জীবন এখন বদলে গেছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগীরা বলছেন, পদ্মার বুকে ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। নানা রকম কষ্টে জীবনের ঘানি টানায় অনিশ্চয়তার যেন শেষ ছিল না। পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যত যেন সেই অনিশ্চয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল আরও কয়েক গুণ। এখন সব ধরনের অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। সংসারে এসেছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও বিভিন্নভাবে আয়ের উপায় খুঁজছেন। আগামীতে আরও সুন্দর দিন আসবে, সেই আশায় বুক বাঁধছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জানে আলম জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে লালখা মোলাইন পুকুর এলাকায় মুজিববর্ষের আশ্রয় প্রকল্পে মোট ৫৫টি ঘর তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘর এবং দুই শতক জমি এরইমধ্যে উপকারভোগী পরিবারগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে পুকুরের চারপাশে ৪১টি এবং বাকিগুলো কাছেই অবস্থিত। পদ্মা-মহানন্দা নদীর তীরবর্তী নদী ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ এখানে আগে থেকেই অস্থায়ী ঘর তৈরি করে বসবাস করছিলেন। তাদের এখন সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ৫৫টি পরিবারের প্রতিটিকে দুই শতাংশ করে জমি সাব রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১১০ শতাংশ হলেই হয়ে যেতো। কিন্তু এখানে প্রায় ৫০০ শত জমি আছে। বাকি জমিতে জীবনমান উন্নয়নে কৃষিসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড করে উপকার ভোগ করছে তারা। এক সময়ের আশ্রয়হীন এই মানুষগুলো এখন বেশ সাচ্ছন্দে জীবানযাপন করছেন। তাদের জীবনে একটি পরিবর্তন এসেছে। এখানে একটি সংযোগ সড়কও তৈরি করা হচ্ছে, সেটির কাজ এখনও চলমান। সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গোদাগাড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মুজিববর্ষের আশ্রয় প্রকল্পের প্রথম তিন পর্যায়ের ঘর হস্তান্তর করা হয়েছে এরইমধ্যে। এর ফলে ৯১২টি গৃহহীন পরিবার আশ্রয় পেয়েছে। চতুর্থ পর্যায়ে আরও ৪০৪টি ঘরের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে, যার মধ্যে ২০০টি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ঘর তৈরিতে ২ লাখ ৮৪ হাজার এবং পরিবহন ব্যয় বাবদ ৫ হাজার টাকা করে ব্যয় হচ্ছে।

SHARE