ঘানি টানছে রিকশা

11

স্টাফ রিপোর্টার: ঘানি ভাঙা সরিষার তেল বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে আদিকালের সেই গরু কিংবা ঘোড়ায় চালিত সরিষার তেলের কথা। কিন্তু দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে গরু কিংবা ঘোড়ায় চালিত সরিষার তেল এখন তেমন আর মেলে না। সম্প্রতি রাজশাহীতে এক ব্যতিক্রমী ঘানি ভাঙা সরিষার তেল তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছে।

সেখানে গরু কিংবা ঘোড়ার বদলে ঘানি টানতে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা অনবরত কাঠের পাটাতন ঘুরিয়ে ভাঙছে সরিষার দানা। একটি কাঠের দণ্ডের ওপর চারদিকে বেষ্টিত কাঠের ভেতরে দেওয়া হয়েছে সরিষার দানা। ওই পাত্রের ওপর একটি কাঠের দণ্ডের চাপে নিঃসৃত হয়ে নিচের একটি পাত্রে জমা হচ্ছে সরিষার তেল। আর এক পাশ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে বাটিতে পড়ছে সরিষার তেল। হাতের স্পর্শ ছাড়াই কাঠের পাটাতন ঘুরিয়ে চাপ দিয়ে সরিষার দানা থেকে রুপান্তর হচ্ছে সরিষার তেলে।

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের শিবপুর বাজারে এই ঘানি ভাঙা সরিষার তেল কারখানা গড়ে উঠেছে। এনজামুল হক টিপু নামের এক যুব উদ্যোক্তা সপ্রণোদিত হয়ে গড়ে তুলেছেন এই কারখানা। শিবপুর বাজারে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের কোল ঘেঁষেই তার তেল ভাঙার কারখানা।

সরেজমিনে দেখা যায়, দৈনিক চার বারে প্রায় ৩৬ কেজি সরিষা ভাঙানো হয়। আর তেল উৎপাদন হয় প্রায় ১২ থেকে ১৩ লিটার। সরিষার বর্জ্য হিসেবে ২২ থেকে ২৪ কেজির মতো খইল পাওয়া যায়। আর প্রতি লিটার তেল সরাসরি বিক্রি হচ্ছে ২৭০ টাকা দরে। তবে অনলাইনে অর্ডারের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি তেলের দাম ধরা হয় ৩০০ টাকা।

এ বিষয়ে যুব এগ্রো’র স্বত্বাধিকারী এনজামুল হক টিপু বলেন, ‘আমরা যুব এগ্রো মূলত ২০১৭ সাল থেকে সারা বাংলাদেশে অনলাইনে বিভিন্ন রকমের কৃষি উপকরণ, কৃষি জাত পণ্য ও কৃষি মেশিনারিজ সরবরাহ করে থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের এই কাঠের ঘানি ভাঙা সরিষার তেলের উদ্যোগ। চলতি বছরের শুরুর দিকে এই ঘানি স্থাপন করা হয়। রংপুরে বেড়াতে গিয়ে এরকম একটা প্রোজেক্ট দেখে মনে হয়, আমাদের এলাকাতেও করা উচিত এবং সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া, আমরা এই পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃতি লাভ করানোর জন্য দ্বিতীয় প্রজেক্ট চালু করতে যাবো।’

ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘এখানে মূলত রোবট গরুর মাধ্যমে তেল উৎপাদন করা হয়। রোবট গরু বলতে গরুর পরিবর্তে এখানে অটোরিকশা ব্যবহার করা হয়। ঘানি ভাঙার সময় গরুর প্রতি অমানবিক নির্যাতন করা হয়। এ পদ্ধতিতে সেটি আর হয় না। গরুর খাবার খরচও লাগে না। এছাড়া গরুর মলমূত্র থেকে সরিষাকে বিশুদ্ধ রাখতে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকরী। কেননা গরু যখন ঘানির চারদিক দিয়ে ঘুরে তখন গরুর মল-বিষ্টা তেলের মধ্যে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেটা থেকে তেলকে মুক্ত রাখার জন্য এই কাঠের ঘানি তৈরি করেছি, যেখানে রোবট গরু ব্যবহার করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো সাড়া পাচ্ছি। সবাইকে শতভাগ বিশুদ্ধ তেল দিতে পেরে ভালো লাগছে।’

কারখানায় কর্মরত আনারুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে সাধারণ কোনো সরিষা ব্যবহার করা হয় না। যেগুলো ব্যবহার করা হয় সবই এক নম্বর মাঘী সরিষা, যেজন্য তেলও এক নম্বর পাওয়া যায়। লোকের অনেক চাহিদা এই তেলের ওপর, এটা আমার খুবই ভালো লাগে।’

তেলের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী কলেজ শিক্ষার্থী বদরুদ্দোজা বলেন, ‘ময়লা আবর্জনা থেকে তেলকে মুক্ত রাখতে এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এতে করে তেলের মানও ভালো থাকছে। আর খাঁটি সরিষার যে ঝাঁজ সেটাও পাওয়া যাচ্ছে। তবে বাজারের সাধারণ তেলের তুলনায় দামটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একেবারে খাঁটি তেল পাওয়া যাচ্ছে।’

এ বিষয়ে বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক দুলাল জানান, সরিষার ঘানি ভাঙা তেলের সময় পশু যে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় সেটা বন্ধ করতে তাদের উদ্যোগটা ব্যতিক্রমী। তাদের তেলের মান ও স্বাদ দুটোই ভালো। তারা সরাসরি মানুষের সামনে তেল ভাঙায়, এতে ক্রেতারা নিজ চোখে তেল উৎপাদন দেখে কিনতে পারছেন।

অন্য যারা এখন তেল উৎপাদন করে তারা লোহার মেশিন দিয়ে ভাঙে কিন্তু এখানে কাঠের গাছ দিয়ে পিষে তেল নামায়। তেল ভালো, তবে দাম একটু বেশি। যুবকদের এমন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার চেষ্টা করবেন বলেও জানান এই জনপ্রতিনিধি।

SHARE