গভীর শ্রদ্ধায় হাসান আজিজুল হককে স্মরণ

16

স্টাফ রিপোর্টার: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে বরেণ্য এই লেখকের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন অনেকেই।

দুপুরে হাসান আজিজুল হকের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এ সময় তিনি বলেন, ‘হাসান আজিজুল হক স্যারের চেতনার যে ব্যাপ্তি, যে দার্শনিক চিন্তা-চেতনা, তিনি আসলে দেশ-জাতির সীমানা পার হয়ে অনেক গভীরে ভাবতে পারতেন এবং লিখতে পারতেন। তিনি বারংবার সেটি প্রমাণ করেছেন।’

লিটন বলেন, ‘তিনি যতদিন আমাদের মাঝে ছিলেন, অজস্র কর্মসূচিতে স্যারকে পেয়েছি, মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তব্য শুনেছি। কখনো কৌতুকের ছলে, কখনো অত্যন্ত ভাবগম্ভীরভাবে তিনি তাঁর কথাগুলো তুলে আনতেন, যাতে থাকতো দেশের কথা, সমাজের কথা ও মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার কথা। হাসান আজিজুল হক স্যার জীবনে যে কর্মকাণ্ডগুলো করেছেন, সেগুলো জাগরুক থাকুক। স্যারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’

এদিন সকালে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার হাসান আজিজুল হকের সমাধিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। সেখানে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে তাঁর আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়।

এ সময় অন্যদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. সুলতান-উল-ইসলাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. হুমায়ুন কবীর, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক (অব.) মো. অবায়দুর রহমান প্রামানিক, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম, প্রক্টর অধ্যাপক মো. আসাবুল হক, জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পাণ্ডে প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পরে দর্শন বিভাগসহ অন্যান্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুস্পস্তবক অর্পণ করে। বেলা সাড়ে ১১টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এই স্মরণসভায় আলোচক হিসেবে হাসান আজিজুল হকের জীবন ও কর্মের উপর আলোচনা করেন রাবি ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. সুলতান-উল-ইসলামের সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার।

স্মরণ অনুষ্ঠানে বাংলা কথাসাহিত্যে অধ্যাপক হাসান আজিজুল হকের অবদানের কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা বলেন, অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক চলার পথে যে মানবিক যন্ত্রণা পেয়েছেন তা তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে একজন নিগৃহীত মানুষকে মানবিক বাস্তবতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ এ বাক্যটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে।

তিনি আরো বলেন, মনুষ্য সত্যকে তিনি যে পূর্ণতা দিয়েছেন সেটা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর যে সাহিত্য প্রতিভা তা বাংলা সাহিত্যজগতে চিরদিন সমাদৃত হয়ে থাকবে। তাঁর প্রতি আমাদের যে আবেগ আছে সেটি মোটেও কাচা নয়, এক গভীর আবেগ। এ আবেগ ধরে রাখতে পারলে আমাদেরই কল্যাণ। তিনি আমাদের গভীরে গেঁথে আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমাহিত করে আমরা চিরস্মরণীয় করে রাখতে পেরে আমরা গর্বিত। যদিও এতে আমাদের বেদনার উপশম হয় না।

সভায় উপাচার্য বলেন, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক যে বিশাল প্রতিভার অধিকারী ছিলো তা এক স্মরণ অনুষ্ঠানের সীমিত পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। বাংলা কথাসাহিত্যের বরপূত্র হাসান আজিজুল হক যখনই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি তখনই তার বিরুদ্ধে লিখেছেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যে কয়েকজন বাংলা সাহিত্যে ক্ষুরধার লেখনী চর্চা করেছেন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর অসাধারণ ভাষাশৈলী, বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে তুলে ধরা, জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তু নির্বাচন এসবই তাঁর কর্মকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তাঁর মৃত্যু আমাদের সাহিত্যঙ্গণে অসীম শুন্যতার সৃষ্টি করেছে। হাসান আজিজুল হককে জানতে ও বুঝতে হলে তাঁর কর্ম নিয়ে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন।

স্মরণ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দর্শন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নিলুফার আহমেদ। সেখানে পরিবারের পক্ষ থেকে হাসান আজিজুল হকের নাতি অনির্বাণ হাসানসহ দর্শন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মহেন্দ্রনাথ অধিকারী, ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নূরুল হোসেন চৌধুরী, বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কবি জুলফিকার মতিন, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এস এম আবু বকর, ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মলয় ভৌমিক প্রমুখ স্মৃতিচারণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম স্মরণসভা সঞ্চালনা করেন।

একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা পাওয়া গুণি কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের জন্ম ১৯৩৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে তিনি দীর্ঘ ৩১ বছর শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতায় অবসর গ্রহণের পর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আবাসিক এলাকা বিহাসের নিজ বাসায় থাকতেন। ৮৩ বছর বয়সে গত বছরের ১৫ নভেম্বর রাত ৯টার দিকে এ বাসায় মারা যান তিনি।

SHARE