ইন্টার্নদের কর্মবিরতি, পাল্টা অভিযোগ রাবির

27

স্টাফ রিপোর্টার: টানা ৭২ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী গোলাম মোস্তফা শাহরিয়ারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল ভাঙচুর ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধরের পর মামলা রেকর্ড না করা এবং কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় কঠোর এই কর্মসূচি দিয়েছেন তারা।

এতে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ এই হাসপাতালটি। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), বিভিন্ন কেবিনসহ ৫৭টি ওয়ার্ডে দিনরাত রোগীদের ভরসা ইন্টার্ন চিকিৎসকেরাই। পুরো হাসপাতালে প্রায় ২৫০ চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা শুধু সকালে একবার ওয়ার্ডে রাউন্ড দেন। বাকি সময়টা ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই হাসপাতাল চালান। তবে তাদের কর্মবিরতির কারণে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের কেউ কেউ থাকছেন।

গত বুধবার রাতে রাবির হবিবুর রহমান হলের তৃতীয় ব্লকের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার। ওই রাতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কতর্ব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় আইসিইউ না চেয়েও না পাওয়া এবং চিকিৎসা না হওয়ার অভিযোগ তুলে রাবি শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে তাদের মারামারির ঘটনাও ঘটে।

এরপর রাবি শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করতে থাকেন। পরে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে রাত ২টায় তারা ক্যাম্পাসে ফেরেন। এরমধ্যে রাত সাড়ে ১১টা থেকে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরাও কর্মবিরতি শুরু করেন। তারা রাবি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতনামা ৩০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয়। পরে শুক্রবার সকাল থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কাজে ফেরেন। কিন্তু আসামি গ্রেপ্তারে তারা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে রাখেন। আল্টিমেটামের সময়ের মধ্যে মামলা রেকর্ড না হওয়ায় এবং কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় শনিবার বিক্ষোভ-সমাবেশ করে তারা ৭২ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে গেলেন।

শনিবার দুপুরে হাসপাতালের সামনে এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বচিপ) ও রামেক হাসপাতাল ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ এ কর্মসূচির আয়োজন করে। হাসপাতাল ভাঙচুর, প্রশাসনিক কাজে বাধা দেওয়া, সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত করা ও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

এতে অংশ নেন হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা, হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী, ডা. খলিলুর রহমান, ডা. আজিজুল হক আজাদ প্রমুখ। এর আগে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।

মানববন্ধনে রামেক হাসপাতাল ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ইমরান হোসেন ৭২ ঘণ্টার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে কাজে ফিরেছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলা রেকর্ড হয়নি। এমনকি কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। তাই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আজ এই মানববন্ধন থেকেই আমরা আগামী ৭২ ঘণ্টার জন্য কর্মবিরতিতে যাচ্ছি। এই তিন দিনের প্রতিদিন আমরা আমাদের দাবি নিয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করব।’

তার এ ঘোষণার পর দুপুর আড়াইটা থেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে হাসপাতালে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগী রোমানা খাতুনের বাবা উম্মর আলী শনিবার দুপুরে বলেন, ‘নার্সেরা কয়েকটা ইনজেকশন লিখে দিয়েছে। কোন ডাক্তার নাই। এখন এই ইনজেকশন লাগবে কি না তা দেখানোর মতোও কাউকে পাচ্ছি না। সকালে শুধু বড় ডাক্তাররা একবার রোগী দেখে গেছে। আর কাউকে পাচ্ছি না।’

রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছি গ্রামের ইদ্রিস আলী হাসপাতালে ভর্তি আছেন গত কয়েকদিন থেকেই। তার ভাতিজা মাসুদ রানা বলেন, ‘হাসপাতালে একজন ডাক্তারেরও দেখা পাচ্ছি না। ওয়ার্ডে শুধু নার্সেরা আছে। ওষুধ কিনে এনে তাদেরও দুই, চার-পাঁচবার করে ডাকতে হচ্ছে। তাহলে তারা আসছে। চিকিৎসার অবস্থা খুবই খারাপ এখন।’

হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘ইন্টার্নরা তাদের দাবি নিয়ে কর্মবিরতিতে গেছে। সিনিয়র ডাক্তাররা দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ইন্টার্নরা না থাকলে সমস্যা হবেই।’ তিনি বলেন, ‘শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর হাসপাতালে যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল তার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা লিখিত অভিযোগ দিলেও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। আমরাও ইন্টার্নদের দাবি যৌক্তিক মনে করছি।’

এদিকে শাহরিয়ারের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে শনিবার সকালে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে শহীদ হবিবুর রহমান হল প্রশাসন। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন উপাচার্যের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও অভ্যন্তরীণ আলাদা কমিটি করে ঘটনা তদন্ত করছে। শনিবার বিকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও থানায় পাল্টা অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাহরিয়ারের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগে বিশ^বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম রাজপাড়া থানায় এ অভিযোগ করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই হামলায় প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। অভিযোগে ওই রাতে হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ও আশেপাশে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক, নার্স, ব্রাদার ও আনসার সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগে কারও নাম নেই। অভিযুক্তরা সংখ্যায় কতজন ছিলেন সেটিও উল্লেখ করা হয়নি।

রাজপাড়া থানার ওসি এএসএম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাবি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আগেই একটা অভিযোগ দিয়েছে। সেটার তদন্ত চলছে। রাবি কর্তৃপক্ষও একটা অভিযোগ দিয়েছে। সেটারও তদন্ত হবে। তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

SHARE