অভিযোগ করে বিপাকে চার নার্স

25

স্টাফ রিপোর্টার: ওয়ার্ডের ইনচার্জের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন চার নার্সিং কর্মকর্তা। তাঁদের এ অভিযোগের কোন তদন্ত হয়নি। উল্টো অভিযোগ করার পর এই চার নার্সিং কর্মকর্তাকেই ওই ওয়ার্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় নার্সিং কর্মকর্তারা হতাশায় পড়েছেন।

এই চার সিনিয়র স্টাফ নার্স হলেন- জাকিয়া সুলতানা, মো. ইব্রাহিম, মোসা. হাসনা হেনা ও রুপালী খাতুন। তাঁরা হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বে ছিলেন। জাকিয়া, রুপালী ও হাসনা হেনা ১৫ বছর এবং ইব্রাহিম ১০ বছর এ ওয়ার্ডে ছিলেন। দীর্ঘ দিন ওই ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করার কারণে হৃদরোগীর সেবায় তাঁরা দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।

এরা প্রত্যেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকেও কার্ডিওলজির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রুপালি খাতুন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্যাথ ল্যাবে ছিলেন। ক্যাথ ল্যাবের ওপর তিনি সরকারী খরচে জাপান থেকেও প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের কঠোর নির্দেশনা আছে, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডেই ডিউটি দিতে হবে। অন্য কোন ওয়ার্ডে সাময়িকভাবেও তাদের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।

অথচ রুপালী খাতুনকে শিশু বিভাগের ২৭ নম্বরে, রুপালিকে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে, হাসনা হেনাকে নাক, কান ও গলা বিভাগের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে এবং ইব্রাহিমকে জরুরি বিভাগে পাঠানো হয়েছে। রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কোন চিকিৎসাই হয় না। রোগী এলেই পাঠানো হয় ওয়ার্ডে। এসব নার্সেরা যে বিষয়ে দক্ষ সে ওয়ার্ড থেকে সরানো হয়েছে শুধু ওয়ার্ডের ইনচার্জ চায়না পারভীনকে রাখার জন্য। এই চায়নার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন চার নার্সিং কর্মকর্তা। গত ২ অক্টোবর হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানীর কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন তাঁরা।

অভিযোগে তাঁরা বলেন, কারণে-অকারণে ওয়ার্ড ইনচার্জ তাদের সাথে অসদাচরণ করেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এ ব্যাপারে সেবা তত্ত্বাবধায়কের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেও তারা কোন প্রতিকার পাননি। অভিযোগে তারা বলেন, ওয়ার্ডে রোগী প্রতি ইসিজি ফি ৮০ টাকা এবং সার্ভিস চার্জ ৮ টাকা। মোট ৮৮ টাকা আদায়ের বিধান থাকলেও ইনচার্জ ৯০ টাকা আদায়ে নার্সদের বাধ্য করেন। অতিরিক্ত দুই টাকা ইনচার্জ চায়না পারভীন রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে সব সময় নিজের কাছে রেখে দেন। কোন নার্সিং কর্মকর্তা যদি অতিরিক্ত দুই টাকা রোগীকে ফেরত দিতে চান তবে সে নার্সিং কর্মকর্তাকে ইনচার্জ চায়না পারভীন বাজে ভাষায় গালাগালি করেন। তিনি বলেন, এই দুই টাকা যারা রোগীর স্বজনকে ফেরত দেবে তাদের হাত ভেঙে দেওয়া হবে।

তাঁরা আরও অভিযোগ করেন, ওয়ার্ডের রোগীদের পেসমেকার বসানো হলে কোম্পানির প্রতিনিধি রোগী প্রতি ৫০০ টাকা করে ডিউটিরত নার্সিং কর্মকর্তাদের নাস্তা বাবদ দিয়ে থাকেন। এই টাকা নেন ওয়ার্ড ইনচার্জ। গত দুই বছরে একদিনও ইনচার্জ নার্সদের নাস্তা করাননি। দুই বছরে প্রায় ১৬৮টি পেসমেকার স্থাপন করা হয়েছে। সেই হিসেবে চায়না পারভীন ৮৪ হাজার টাকা আত্মসাত করেছেন। এসব অভিযোগের কোন তদন্তই করা হয়নি।

ভুক্তভোগী নার্সিং কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগ করার পর হাসপাতাল পরিচালক দুপক্ষকেই তাঁর কার্যালয়ে ডাকেন। কিন্তু তাঁদের কোন কথা শোনেননি। শুধু ওয়ার্ড ইনচার্জ চায়না পারভীনের কথা শোনেন। পরিচালক এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন জানিয়ে সবাইকে যেতে বলেন। হঠাৎ ৭ অক্টোবর থেকে তাদের অন্য ওয়ার্ডে দায়িত্ব দেন নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট।

জানতে চাইলে হাসপাতালের নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহাদাতুন নূর লাকি বলেন, ‘আমি অসুস্থ থাকায় হাসপাতালে গিয়ে সব জানতে পারিনি। তবে যাঁরা অভিযোগ করেছেন তাঁরা আমার নার্স, অভিযুক্তও আমার নার্স। তাই এ বিষয়টা তদন্ত করা উচিত ছিল। তারপরই একটা ব্যবস্থা হতে পারত। তা না করে অভিযোগকারীদেরই সরিয়ে দেওয়া দুঃখজনক।

চার নার্সের তোলা দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেছেন অভিযুক্ত ওয়ার্ড ইনচার্জ চায়না পারভীন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়টা পরিচালক স্যার সমাধান করে দিয়েছেন। আমি কোন কথা বলব না।’ হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘পরিচালকের নির্দেশনায় ওই চার নার্সকে মৌখিকভাবে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কয়দিন পর ঠিক হয়ে যাবে।’ দক্ষ-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সদের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকে না সরানোর নির্দেশনা থাকার পরও এই চারজনকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘অনেক নির্দেশনা আছে, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী স্বীকার করেন নার্সদের তোলা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হয়নি। অভিযোগকারীদেরই সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ইনচার্জ থাকলে অভিযোগকারী নার্সেরা থাকতে চান না, আবার অভিযোগকারীরা থাকলে ইনচার্জ থাকতে চান না। আমাকে তো ওয়ার্ড চালাতে হবে। তাই এ সিদ্ধান্ত।’

SHARE