বাংলা নাট্যের নৌযাত্রা

15

স্টাফ রিপোর্টার: পদ্মার বুকে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকাতেই নানা রঙের পতাকা। সব সামনের নৌকাটিতে একটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও। আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড়সড় একটি ছবিও। এই নৌকাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বুদ্ধ নাটক’। বহরে থাকা ১৫টি নৌকারই আলাদা আলাদা নাম। একটি করে প্রখ্যাত ব্যক্তির ছবি।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের গৌরবের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে এভাবেই শনিবার রাজশাহীর পদ্মা নদীতে ‘বাংলা নাট্যের নৌযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নৌকাগুলোতে যাঁরা সওয়ারী হয়েছিলেন, তাঁরা সবাই সাংস্কৃতিককর্মী। রাজশাহী নগরীর আলুপট্টি বটতলার পদ্মার পাড় থেকে বেলা ১১টার দিকে নৌযাত্রা শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে জেলার চারঘাট উপজেলায় বড়াল পাড়ে গিয়ে পৌঁছায় এই নৌযাত্রা। তারপর আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সকালে নৌযাত্রা শুরুর আগে সাংস্কৃতিককর্মীরা সবাই একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন জাতীয় সংগীত। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি থাকা নৌকাটিতে যাত্রা করেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। অন্য ১৪টি নৌকার মধ্যে ‘কৃষ্ণলীলা ও রাধা লীলা’ নৌকায় নৌকায় বহন করা হয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি, ‘সংযাত্রা’ বাউল সম্রাট লালন শাহর ছবি, ‘বাহা উৎসব’ নৌকায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের, ‘পুতুল নাচ’ নৌকায় রাজা রামমোহন রায়ের, ‘গম্ভীরা’ নৌকায় সেলিম আল দ্বীনের, ‘কিচ্ছা গান’ নৌকায় চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, ‘মাদার গান’ নৌকায় অক্ষয় কুমার মৈত্রৈয় এবং ‘আলকাপ গান’ নৌকায় লোকনাট্য গবেষক কাজী সাঈদ হোসেন দুলালের ছবি বহন করা হয়েছে। এক ঘণ্টার পথ পাড়ি নৌকাগুলো বড়ালের মোহনায় যায়। যাত্রাপথে নৌকাতেই নেচে-গেয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। এই নৌবহর দেখতে পদ্মার বাঁ তীরে নারী-শিশুসহ সব বয়সী মানুষ ভিড় করেন।

হাতের মুঠোয় হাজার বছর আমরা চলেছি সামনে স্লোগানকে সামনে রেখে নৌবহরটি বড়াল পাড়ে পৌঁছালে চারঘাট গ্রাম থিয়েটারের সদস্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাঁদের স্বাগত জানান। এরপর চারঘাট পদ্মা বড়াল থিয়েটারের ইলামিত্র মঞ্চ থেকে সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় একটি র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। এটি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদের হলরুমে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

শুরুতেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠান মঞ্চে সম্মাননা দেওয়া হয়। সভার শুরুতে চারঘাট পদ্মা বড়াল থিয়েটারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এখলাক হোসেন অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। এরপর বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যত্বত্ত্ব বিভাগের অধ্যপক লুৎফর রহমান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফকরুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন, পৌর মেয়র একরামুল হক প্রমুখ।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, বিগত প্রায় চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশবাপী বাংলার এতিহ্য এবং সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে আসছে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। আমাদের উদ্দেশ্য বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনাকে সুসংহত করে ভবিষ্যতের অভিসারী করা। তারই অংশ হিসেবে এই নৌযাত্রা চারঘাট এসেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জায়গায় এই সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা করা হবে। এটি আমাদের হাজার বছরের লোক সংস্কৃতিকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।

আলোচনা সভা শেষে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও লোক গবেষক কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল, চারঘাট পদ্মা বড়াল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক ও সদস্য আজমল হকের মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাথাল রাজশাহীর পরিবেশনায় গম্ভীরা, গ্রাম থিয়েটারের পরিবেশনায় আলকাপ রঙ্গরস এবং চারঘাট বড়াল থিয়েটারের পরিবেশনায় মাদার অবলম্বনে বহুরূপে আসবো ফিরে ও মনসামঙ্গল অবলম্বনে নীলমণি পরিবেশিত হয়।

SHARE