বরেন্দ্রজুড়ে পানির সংকট

9

স্টাফ রির্পোটার : একটা সময় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল বরেন্দ্র খ্যাত রাজশাহী অঞ্চল। তবে পরিবেশগত বিরূপ কর্মকাণ্ডে পাল্টে যায় দৃশ্যপট। দুর্দিন নেমে আসে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের। কালক্রমে একটা সময় সুদিন ফিরেছে। ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এখন দেশের অন্যতম শষ্য ভান্ডার। তবে এর শুরুটা বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) ভূ-গর্ভস্থ পানির সেচ কার্যক্রমের মাধ্যমে। আর সর্বনাশের শুরুটাও হয় তখন থেকেই।

সংকট টের পেতে বিএমডিএর কেটে যায় প্রায় তিন যুগ। বিএমডিএ পিছু হটলেও পানি তুলতে নেমে পড়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। পানি নিয়ে এই বাণিজ্য, সংকট আরও বাড়াচ্ছে।

ইতিহাস বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের পানি সংকট নিত্য দিনের সঙ্গী। যুগ যুগ ধরে এটি চলে আসছে। তিন দশক আগেও গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সেচের বন্দোবস্ত হতো পুকুর-দীঘি, নদী-নালা থেকে। কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয়ের ফলে ভূ-উপরস্থ পানির সংকট দেখা দেয়। এরপরই শুরু হয় ভূ-গর্ভস্থ পানির উৎসের সন্ধান।

সংশ্লিষ্ট একাধিক নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ষাটের দশকের প্রথম দিকে দেশে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বসানো শুরু। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় (রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) এক হাজার গভীর নলকূপ স্থাপনের সুপারিশ করে গবেষণা সংস্থা জিও টেকনিকা যুগোশ্লাভিয়া।

কিন্তু এই পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়ে বরেন্দ্র ভূমির প্রায় ৭৫০ বর্গমাইল এলাকা। এর দুই বছর পর ১৯৭৩ সালে আইডিএ প্রকল্পের মাধ্যমে ৩ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা থেকেও এই অঞ্চলটি বাদ পড়ে যায়।

১৯৮২ সালে ইউএনডিপি প্রকাশিত এক কারিগরি প্রতিবেদনে বরেন্দ্র জোনকে জিরো অ্যাক্যুইফার হিসেবে দেখানো হয়। তাতে উল্লেখ করা হয়, জিরো অ্যাক্যুইফারে ৩০০ মিটার (৯৮০ ফিট) গভীরতার মাঝে গভীর নলকূপের সাহায্যে তোলার মতো পানি নেই। যদি কিছু থেকে থাকে তা গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

এরপর ১৯৮৫ সালে বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা চালায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংস্থাটি কারিগরি প্রতিবেদনে জানায়, শুধুমাত্র হস্তচালিত গভীর নলকূপে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভ থেকে পানি তোলা সম্ভব। ওই বছরই বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গভীর নলকূপ বসানো শুরু হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল, পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের ২ লাখ ২৫ হাজার একর জমি সেচর আওতায় আনা।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে এই অঞ্চলে ফসলের নীবিড়তা ১১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়। এই প্রকল্পটি এক পর্যায়ে বিএমডিএতে স্থায়ী রুপ পায়। বর্তমানে ১৫ হাজার ৫৫৩টি গভীর নলকূপে পানি তুলছে বিএমডিএ।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএমডিসি) ক্ষুদ্র সেচ সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০১৯-২০ অনুযায়ী, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট সেচ পাম্প রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৫৮টি। এর মধ্যে বিএমডিএর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয় ৮ হাজার ৫২৫টি। বাকি ৯৬ হাজার ৩৩৩টি পাম্প চলছে ব্যক্তি মালিকানায়।

এই তিন জেলার ৫ লাখ ৭ হাজার ১৪৫ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে। এর মধ্যে বিএমডিএ সেচ দিচ্ছে ২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬১ হেক্টর জমিতে। বাকি ২ লাখ ১১ হাজার ৩৮৬ হেক্টর জমিতে সেচ দিচ্ছে ব্যক্তিগত সাবমার্সিবল পাম্প (এসটিডাব্লিউ) থেকে।

ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৫৩ হাজার ৯২৩টি ব্যক্তি মালিকানায় পাম্প রয়েছে নওগাঁয়। এই জেলার সেচের ৫১ শতাংশ তাদের দখলে। বাকি ৪৯ শতাংশ জমি সেচ পাচ্ছে বিএমডিএর সেচ পাম্প থেকে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহীতেও একই চিত্র। রাজশাহীতে ২ হাজার ৮৫২টি বিএমডি এর পাম্প চললেও এসটিডাব্লিউ চলছে ২৭ হাজার ১০৫টি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১ হাজার ৫৮৩টি বিএমডি এর পাম্পের পাশাপাশি ১৫ হাজার ৩১৫টি এসটিডাব্লিউ চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনোভাবেই ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনে এককভাবে বিএমডিএকে দায়ি করা যায় না। যদিও তারাই এর শুরুটা করেছে। পরিবেশগত ঝুঁকি টের পেয়ে ২০১৪ সাল থেকে গভীর নলকূপ বসানো বন্ধ রেখেছে বিএমডিএ। কিন্তু বন্ধ নেই ব্যক্তি মালিকানায় পাম্প বসানো। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই পাম্প চলছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানে এই তথ্যের সত্যতাও মেলে।

বিএমডিএর নিয়ামতপুর জোনে গভীর নলকূপ স্থাপনের হালনাগাদ তথ্য নেই। বছর দুয়েক আগের হিসেবে, উপজেলায় বিএমডিএ পরিচালিত গভীর নলকূপ রয়েছে ৬৯৪টি। এ ছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৯২টি গভীর নলকূপ এবং ৮৩৩টি এসটিডাব্লিউ রয়েছে উপজেলাজুড়ে

এই দুই বছরে ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ ও এসটিডাব্লিউ এর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ঠাঁ ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকা উপজেলার রসূলপুর ইউনিয়ন। দুই বছর আগে এই ইউনিয়নে ১৩৫টি গভীর নলকূপের পাশাপাশি ১৪২টি এসটিডাব্লিউ বসানো হয়েছে।

বিএমডিএর সেখানকার সহকারী প্রকৌশলী মতিউর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের চেয়ে রসূলপুরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে। ফলে এতদিন এখানে সীমিত ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক চাপে প্রচুর এসটিডাব্লিউ দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ জমির পরিমাণ বেশি দেখিয়ে একাধিক এসটিডাব্লিউ বসিয়েছেন। কোথাও কোথাও বিএমডিএর সেচের অধিক্ষেত্রেও ভাগ বসাচ্ছে। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছেন না।

পানি শাসনের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে জানিয়েছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান সজল। তিনি বলেন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাদের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এই পানি বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশের একমাত্র তিন ফসলি জমি বরেন্দ্র অঞ্চলেই। এখানে সেচের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ আছে। জাতীয় গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় অর্ধেক কম বৃষ্টিপাত হয় এই এলাকায়। একবার বৃষ্টি হলে দীর্ঘকালীন খরা যায়। হলে ফসল বাঁচাতে কৃষকদের প্রচুর ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলতে হয়। এ জন্যই ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ পড়ে।

বরেন্দ্রজুড়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এই কমিটির সদস্য অধ্যাপক সজল। তিনি বলেন, একটি স্তরের নিচে আর কোনো পানির স্তর আছে কিনা সেটি সমীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। কোনো এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণা করতে হলে পর্যাপ্ত তথ্য এবং গবেষণা প্রয়োজন। সেই গবেষণা এখন চলমান।

ড. সজল আরও বলেন, বিধি-নিষেধের কারণে বিএমডিএ আর গভীর নলকূপ বসাচ্ছে না। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগ থামানো যাচ্ছে না। তাদের থামানোর জন্য দেশে পানি আইন ও পানি বিধিমালায় প্রক্রিয়া চালু আছে। সেটা সরকার বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগী না হলে সর্বনাশী কাজ থামবে না।

সরকার উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু সফল হয়নি। এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব জড়িত। স্থানীয় বিষয়-আশয় জড়িত। ফলে আইন না মেনেই সংশ্লিষ্ট যে দপ্তরগুলোর কাজ করার কথা তাদের তোয়াক্কা না করে বা চাপ প্রয়োগ করে গভীর নলকূপ বসানো হচ্ছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদ। তিনি বলেন, ভূ-গর্ভস্থ সেচ বরেন্দ্র শুরু করেছিল ঠিকিই, কিন্তু প্রযুক্ত স্থানান্তর হয়ে গেছে। সেচের গুরুত্ব বাড়ায় ব্যক্তি মালিকানায় ছোটো গভীর নলকূপ বসানো হচ্ছে। বরেন্দ্র সেচের অধিক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণে এমন গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এটা কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না।

তিনি যোগ করেন, এখন রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় ৫৮ শতাংশ পানি তোলে বিএমডিএ। বাকি ৪২ শতাংশ পানি তোলে ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ। সেচ ছাড়াও ভূ-গর্ভস্থ পানি কলকারখানায় ব্যবহার হচ্ছে। মাছ চাষের জন্য পুকুরেও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে বিএমডিএ পানি তুলে ভূ-গর্ভ খালি করে দিচ্ছে- এই কথা ঢালাওভাবে বলার সুযোগ নেই।

নির্বাহী পরিচালক বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম ভূ-গর্ভস্থ সেচ কার্যক্রম শুরু করে বিএমডিএ। প্রায় ৮৫ শতাংশ জমি সেচের আওতায় আসল। কিন্তু ভূ-র্ভস্থ পানি উত্তোলনে একটা সংকট থেকেই যায়। ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নামছে। এরপর পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় ২০১৪ সালে গভীর নলকূপ স্থাপন বন্ধ করে বিএমডিএ। কেবল পুরনোগুলো মেরামত করে চালু রাখা হয়েছে। সেটি না হলে কৃষি উৎপাদন ব্যহত হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝূঁকিতে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ভূ-উপরস্থ সেচ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছি। পদ্মা-মহানন্দা-আত্রাই নদীর পানি তুলে সেচের কাজে লাগানো হচ্ছে। বৃষ্টির পানি আহরণে বড় বড় পুকুর-দীঘি এবং খাল পুনর্খনন করা হচ্ছে। এখন সেচের প্রায় ১০ শতাংশ পানি আসছে ভূ-উপরস্থ উৎস থেকে। আমরা চেষ্টা করছি ধীরে ধীরে ভূ-উপরস্থ সেচের পরিধি বাড়ানোর। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

SHARE